মহাকাশে মহাজাগতিক বিস্ময়! মঙ্গলে ১৮০০ কিমি দীর্ঘ রহস্যময় মেঘ, তাজ্জব বনে গেলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা

লাল গ্রহ মঙ্গলকে নিয়ে মানুষের বিস্ময়ের শেষ নেই। এবার সেখানে ঘটে গেল এক অভূতপূর্ব মহাজাগতিক ঘটনা, যা দেখে তাজ্জব হয়ে গেছেন বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানের গবেষকরা। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ESA) ‘মার্স এক্সপ্রেস’ মহাকাশযান মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলে ১৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি অদ্ভুত ও বিশাল বরফের মেঘের সন্ধান পেয়ে চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছে।
ধুলো ছাড়াই মহাকাশে আস্ত বরফের মেঘ!
মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন সকালে ২০ কিলোমিটার উঁচু ‘আরসিয়া মনস’ (Arsia Mons) নামক আগ্নেয়গিরির কাছে এই রহস্যময় সাদা মেঘ ভেসে উঠতে দেখা যায়। সায়েন্সের ভাষায় এই মেঘটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘আরসিয়া মনস ইলংগেটেড ক্লাউড’ (AMEC)।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, অত্যন্ত দ্রুত উবে যাওয়ার আগে এই মেঘটি ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ১৮০০ কিলোমিটার পর্যন্ত— যা আয়তনে সমগ্র ব্রিটেনের দৈর্ঘ্যের প্রায় দ্বিগুণ! প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের (LMD/CNRS) প্রধান গবেষক হোর্হে হার্নান্দেজ-বার্নাল জানিয়েছেন, পৃথিবীতে মেঘ বা বরফের স্ফটিক তৈরি হতে গেলে বায়ুমণ্ডলে ধূলিকণা বা লবণের কণার উপস্থিতি (হেটেরোজিনিয়াস নিউক্লিয়েশন) বাধ্যতামূলক। কিন্তু মঙ্গলের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ধূলিকণা ছাড়াই জলীয় বাষ্প সরাসরি জমে গিয়ে বরফে পরিণত হচ্ছে এবং তৈরি করছে এই সুবিশাল মেঘ।
মঙ্গলের চরম বায়ুমণ্ডল ও বৈজ্ঞানিক রহস্য
বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে আমরা যে আর্দ্রতা দেখি, তার চেয়ে অন্তত ১ লক্ষ গুণ বেশি আপেক্ষিক আর্দ্রতা থাকলে তবেই ধূলিকণা ছাড়া এই ধরনের ‘হোমোজিনিয়াস নিউক্লিয়েশন’ সম্ভব। মঙ্গলের পাতলা বায়ুমণ্ডল এবং সুবিশাল উঁচু আগ্নেয়গিরি মিলে সেখানকার বাতাসকে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে কয়েক কিলোমিটার ওপরে ঠেলে পাঠিয়ে দেয়। এর ফলে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে সেখানকার বাতাসের তাপমাত্রা এক ধাক্কায় প্রায় ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে চরম শীতল হয়ে যায়।
유রোপীয় স্পেস এজেন্সির ‘মার্স এক্সপ্রেস’ ২০১৮ সালে প্রথম এই মেঘ আবিষ্কার করলেও, সম্প্রতি ভিজ্যুয়াল মনিটরিং ক্যামেরা, হাই-রেজোলিউশন স্টেরিও ক্যামেরা ও ‘এক্সোমার্স ট্রেস গ্যাস অরবিটার’-এর নিখুঁত ডেটা অ্যানালিসিস থেকে আসল রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে।
বইয়ের পাতায় থাকা তত্ত্ব এবার মহাকাশে সত্যি প্রমাণ!
পদার্থবিদ্যার এই বিশেষ নিয়মকে এতদিন ধরে স্রেফ পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ একটি তত্ত্ব বলে মনে করা হতো। তবে বিজ্ঞানীরা যখন আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশনে এই নিউক্লিয়েশনের নিয়ম যুক্ত করেন, ঠিক তখনই মার্স এক্সপ্রেসের তুলে আনা মেঘের আসল গঠনটি হুবহু তৈরি করা সম্ভব হয়।
খ্যাতনামা বিজ্ঞান পত্রিকা ‘নেচার জিওসায়েন্স’ (Nature Geoscience)-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি কেবল মঙ্গল গ্রহ নয়, বরং সৌরজগতের বাইরের অন্যান্য অচেনা গ্রহের (Exoplanets) আবহাওয়া ও বায়ুমণ্ডল বোঝার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানের নতুন দরজা খুলে দেবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।