“ভাড়া করা গাড়িতে কোটিপতির ভান!”-তরুণীদের ফাঁদে ফেলে লক্ষ লক্ষ টাকা লুঠ যুবকের

ইনস্টাগ্রাম রিলসে দামি মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউ গাড়ির সঙ্গে পোজ, গায়ে ব্র্য্যান্ডেড জামাকাপড়, বিলাসবহুল জীবনযাপন—আর বাহ্যিক রূপ দেখে একেবারে বলিউডের নায়কদের মতো দেখতে এক যুবকের প্রেমে দিওয়ানা হতেন একের পর এক তরুণী! আর সেই ফাঁদেই একে একে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন একাধিক মহিলা পুলিশকর্মী। লোভনীয় ‘প্যাকেজ’ ও মিথ্যে পরিচয়ের আড়ালে মহিলাদের সঙ্গে প্রতারণা করার অভিযোগে শেষ পর্যন্ত ২৩ বছরের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে দিল্লি পুলিশ। ধৃতের নাম বিক্রান্ত তোমর।
কীভাবে ফাঁদ পাতত এই প্রতারক? পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, করোল বাগ থানায় কর্মরত শিবানী নামে এক মহিলা কনস্টেবলের কাছ থেকে বিনিয়োগের নাম করে প্রায় ২৪ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে এই বিক্রান্ত। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়া ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমেই ওই কনস্টেবলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সে। দিল্লি পুলিশে স্পোর্টস কোটায় চাকরি পাওয়ার উপায় নিয়ে পরামর্শ চাওয়ার অছিলায় শুরু হয় আলাপ। এরপর হোয়াটসঅ্যাপে নিয়মিত কথাবার্তা এগোতে থাকে। নিজেকে ক্রিকেট জগতের এক পরিচিত মুখ হিসেবে তুলে ধরে তরুণীদের বিশ্বাস অর্জন করত বিক্রান্ত। ধীরে ধীরে সেই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে মোটা অঙ্কের লাভের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন স্কিমে টাকা বিনিয়োগ করতে বাধ্য করত সে।
পুলিশের দাবি, অভিযুক্তের মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে নিজের জমানো টাকা তো বটেই, এমনকি ১২ লক্ষ টাকার পার্সোনাল লোনও নিয়েছিলেন ওই মহিলা পুলিশকর্মী। শুধু তাই নয়, পরিচিতদের কাছ থেকেও চড়া সুদে টাকা ধার করেন তিনি। এর মধ্যে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা বিক্রান্তের কথামতো ‘1x.com’ নামক একটি বেটিং প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল বলে জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। এমনকী, দেখা করতে গিয়ে ওই কনস্টেবলের সঙ্গে অত্যন্ত অশালীন আচরণের অভিযোগও রয়েছে ওই যুবকের বিরুদ্ধে।
ভাড়া করা মার্সিডিজে কোটিপতির ভান! তদন্তে নেমে পুলিশ যা জানতে পেরেছে, তা এককথায় চমকে ওঠার মতো। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেকে একজন অত্যন্ত ধনী ব্যবসায়ী হিসেবে জাহির করতে দামি বিলাসবহুল গাড়ির সঙ্গে হামেশাই ছবি ও ভিডিয়ো আপলোড করত বিক্রান্ত। যে গাড়িগুলিতে সে চড়ত, তার একটিও তার নিজের ছিল না! ঘণ্টার পর ঘণ্টা হিসেবে গাড়ি ভাড়া করে সেই মার্সিডিজ বা বিএমডব্লিউ-তে বসিয়েই বিভিন্ন মহিলাকে ডেটে নিয়ে যেত সে। একই ভাড়া করা গাড়ি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে নিজের বিপুল আর্থিক প্রতিপত্তির মিথ্যে ধারণা তৈরি করত সে। অর্থাৎ, গাড়িগুলো ছিল ভাড়ার, কিন্তু চালবাজি ছিল একেবারে পাকা!
বিস্তৃত জালিয়াতির জাল ও অতীত রেকর্ড: পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, বিক্রান্তের সঙ্গে এক মহিলা কনস্টেবলের লিভ-ইন সম্পর্কও ছিল। সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই ওই মহিলার ব্যাচের অন্যান্য মহিলা পুলিশকর্মীদেরও নিশানা করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। প্রাথমিক তদন্তে অন্তত ২০ জন মহিলা এই প্রতারণার শিকার হয়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, বিক্রান্তের বিরুদ্ধে এর আগেও দিল্লির বিভিন্ন থানায় মোট পাঁচটি প্রতারণার মামলা নথিভুক্ত রয়েছে। গত জুন মাসেই জামিনে জেল থেকে মুক্তি পেয়েছিল সে। বর্তমানে তার সমস্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ও আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখে এই প্রতারণা চক্রের শিকড় কতদূর বিস্তৃত, তা খুঁজছেন পুলিশ আধিকারিকরা।
সোশ্যাল মিডিয়ার চাকচিক্য, দামি গাড়ি কিংবা মুখের মিষ্টি কথায় গলে গিয়ে কাউকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করার আগে দু’বার ভাবা উচিত—এই ঘটনা যেন সেটাই ফের চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিল।