ব্রিকস সম্মেলনের আগেই বেজিংয়ের ওপর বড় চাপ বাড়াতে চলেছে ভারত! চিনকে কোন কঠিন শর্ত দিচ্ছে মোদী সরকার?

দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন চললেও, আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন দিল্লিতে আয়োজিত হতে চলা আসন্ন ব্রিকস (BRICS) সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ভারত ও চিনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনরায় মজবুত এবং স্বাভাবিক করার তীব্র প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে। বিশ্বখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, এই মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকেই চিনের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসতে চলেছেন ভারতীয় প্রতিনিধিরা। আর সেই বৈঠকেই বেজিংয়ের সামনে একগুজো জোরালো দাবি ও কড়া শর্ত তুলে ধরতে পারে নয়াদিল্লি। মূলত বিগত বেশ কিছুদিন ধরে চীন থেকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, কাঁচামাল এবং যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে ভারতীয় শিল্পসংস্থাগুলোকে নানাবিধ পদ্ধতিগত জটিলতা ও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, যা নিয়ে চরম অসন্তোষ রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের অন্দরে।
প্রতিবেদন সূত্রে আরও জানা গিয়েছে যে, চিনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমান বাজার পরিস্থিতির কী কী প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন শীর্ষ শিল্পক্ষেত্রের প্রতিনিধি ও ব্যবসায়িক মহলের সঙ্গে জরুরি আলোচনা শুরু করে দিয়েছে কেন্দ্র। আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ফলে সম্মেলনে তাঁর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলেই এই স্পর্শকাতর অর্থনৈতিক বিষয়গুলো জোরালোভাবে উত্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের। বিশেষ করে রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট (Rare Earth Magnet) এবং ক্রিটিক্যাল টেকনোলজির মতো একাধিক অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত ক্ষেত্রে চিনের তরফ থেকে যে আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা অবিলম্বে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করার দাবি জানাবে ভারত। একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হবে যে, ভারতীয় বিনিয়োগের ওপর বেইজিং যে অনাবশ্যক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে রেখেছে, তাও যেন অবিলম্বে তুলে নেওয়া হয়। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে চিনা বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসতে পারেন ভারতের শিল্প এবং বাণিজ্য মন্ত্রকের শীর্ষস্থানীয় আমলারা। প্রসঙ্গত, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও স্পেশালাইজড কম্পোনেন্ট আমদানির ক্ষেত্রে চিনের কঠোর নীতির কারণে ভারতের উদীয়মান অটোমোবাইল এবং ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন ক্ষেত্র যথেষ্ট বড় ধরনের সমস্যার মুখে পড়ছে।
তবে এতকিছুর পরেও ভারত ও চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। গত ১ সেপ্টেম্বর ভারতে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ভারতের বাণিজ্য সচিব রাজেশ আগরওয়ালের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হন। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতাসংক্রান্ত একাধিক জটিল বিষয় নিয়ে সেই বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে চিনের বিদেশ মন্ত্রক। এমনকি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতও নমনীয়তার ইঙ্গিত দিয়ে চিনের কিছু বিনিয়োগ ও সংস্থাসমূহের ওপর আরোপিত কঠোর বিধিনিষেধ কিছুটা হলেও শিথিল করেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের প্রথম প্রান্তিকে অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে চিনের বাজারে ভারতের মোট রফতানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৫.৫৫ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের এই নতুন অর্থনৈতিক কূটনীতি আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে এক বিরাট প্রভাব ফেলতে চলেছে বলেই ধারণা রাজনৈতিক মহলের।