বিহারের ৩২ লক্ষ কৃষকের কপালে চিন্তা! শুধু আধার কার্ড থাকলেই আর মিলবে না সরকারি প্রকল্পের টাকা?

বিহারের লক্ষ লক্ষ কৃষকের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বড় খবর সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন কৃষি প্রকল্পগুলির আর্থিক সুবিধা নির্বিঘ্নে পেতে এখন থেকে শুধু আধার কার্ড এবং ই-কেওয়াইসি যথেষ্ট হবে না। কৃষি খাতে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং প্রকৃত কৃষকদের সরাসরি সরকারি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করতে সরকার দ্রুত ‘কৃষক আইডি’ বা ইউনিক ফার্মার আইডি বাধ্যতামূলক করার দিকে এগিয়ে চলেছে। তবে, বিহারে জমির মালিকানা এবং ভূমি রাজস্ব রেকর্ডে নানাবিধ অসঙ্গতির কারণে প্রায় ৩২ লক্ষ কৃষক এখনও এই নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা থেকে পিছিয়ে পড়েছেন, যা আগামী দিনে তাদের পিএম কিষাণ সম্মান নিধি সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার প্রবল আশঙ্কা তৈরি করেছে।
বিহার কৃষি দপ্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে প্রায় ৮৫.৫৩ লক্ষ সুবিধাভোগী কৃষকের জন্য কৃষক পরিচয়পত্র তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে ব্যাপক প্রচার অভিযান সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত মাত্র ৫৩.৪৫ লক্ষ কৃষক এই প্রক্রিয়ায় সফলভাবে নিবন্ধিত হয়েছেন। প্রায় ৩২ লক্ষ কৃষক এখনও এই ডিজিটাল নথির আওতায় আসতে পারেননি। এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে যে, বহু কৃষক পৈতৃক জমিতে বংশপরম্পরায় চাষবাস করলেও জমির মিউটেশন বা নামপত্তন তাদের নিজেদের নামে নথিভুক্ত করাননি। পাশাপাশি, অনেক কৃষক জীবিকা নির্বাহের তাগিদে রাজ্যের বাইরে বসবাস করায় এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারছেন না।
নতুন এই কৃষক নিবন্ধন ব্যবস্থা সরাসরি সরকারি ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন কৃষকের আসল পরিচয় ও জমির মালিকানা যাচাই করা হয়। কৃষকের আধার কার্ড, নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং জমির খসরা বা খাতা নম্বর একে অপরের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলতে হবে। যদি রাজস্ব দপ্তরের নথিতে জমিটি অন্য কারও নামে নিবন্ধিত থাকে কিংবা নাম বা ঠিকানায় কোনো সামান্য ভুলও থেকে যায়, তবে কৃষক পরিচয়পত্র ইস্যু করা সম্ভব হবে না। মূলত ভুয়া বা অযোগ্য এবং আয়কর প্রদানকারী সুবিধাভোগীদের এই প্রকল্প থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র প্রকৃত ও প্রান্তিক কৃষকদের হাতে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়াই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
বিশেষ করে বর্গাচাষী এবং অ-রায়ত কৃষকদের জন্য এই নতুন কৃষক পরিচয়পত্র ব্যবস্থা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিহারের একটি বিশাল অংশের মানুষ অন্যের জমিতে বর্গাচাষী হিসেবে কঠোর পরিশ্রম করে জীবনযাপন করেন। যেহেতু জমির প্রকৃত মালিক অন্য ব্যক্তি, তাই সরকারি নথিতে বর্গাচাষীদের নাম সাধারণত নথিভুক্ত থাকে না। এর ফলে বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে যে, সরকারের দেওয়া ভর্তুকি ও প্রকল্পের প্রকৃত সুফল কি সত্যিই মাঠের পরিশ্রমী কৃষকদের কাছে পৌঁছাবে, নাকি তা থেকে বঞ্চিত হতে হবে।
ডিজিটাল কৃষক পরিচয়ের এই পরিধি কেবল পিএম কিষাণ যোজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। ভবিষ্যতে সরকারি ভর্তুকিযুক্ত সার ও উন্নত মানের বীজ সংগ্রহ করা, কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর দেওয়া আর্থিক সহায়তা গ্রহণ, সরকারি সংগ্রহ কেন্দ্রগুলিতে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) ফসল বিক্রি করা এবং প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমার সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই কৃষক আইডি অত্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হবে। এই সমস্ত জরুরি পরিষেবা এবং সুবিধার একমাত্র মূল মাধ্যম হবে এই বিশেষ আইডি। সম্প্রতি বিহার সফরকালে কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, দেশব্যাপী ১০৪.১ মিলিয়নেরও বেশি কৃষক আইডি সফলভাবে তৈরি করা হয়েছে, যার সুবাদে কৃষকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি এবং অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে তহবিল স্থানান্তর করা সম্ভব হচ্ছে।
এই সমস্ত জটিলতা এড়াতে এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিহারের কৃষকদের অবিলম্বে কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে কৃষি দপ্তর। প্রথমত, জমির জামাবন্দি বা রসিদে থাকা নাম ও বিবরণ সম্পূর্ণ সঠিক আছে কি না তা ভালো করে যাচাই করে নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আপনার বর্তমান এবং সচল মোবাইল নম্বরটি আধার কার্ডের সঙ্গে হালনাগাদ রাখতে হবে। তৃতীয়ত, আধার কার্ড, ব্যাংক পাসবুক এবং জমির সমস্ত আইনি নথিতে নামের বানান যেন হুবহু এক থাকে। চতুর্থত, পিএম কিষাণ পোর্টালে গিয়ে অবিলম্বে ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে। পঞ্চমত, বিহার কৃষক নিবন্ধন পোর্টালে প্রবেশ করে ওটিপির মাধ্যমে অনলাইনেই আবেদন করতে হবে। এবং ষষ্ঠত, যদি চাষের জমিটি এখনও পূর্বপুরুষদের পুরোনো নামে থেকে থাকে, তবে দ্রুত আইনসম্মত উপায়ে নিজের নামে মালিকানা পরিবর্তনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।