বিশ্বকর্মার দিনে এ কোন পুজো! জঙ্গলঘেরা ডুয়ার্সের গ্রামে হাতিকে ‘মহাকাল’ ডেকে কেন পুজো করেন কৃষকরা?

চারদিকে যখন কলকারখানা আর যন্ত্রের দেবতা বিশ্বকর্মার আরাধনায় মুখরিত গোটা বাংলা, ঠিক তখনই জলপাইগুড়ির ময়নাগুড়ির জঙ্গল লাগোয়া জনপদে দেখা যায় এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি। রাত পোহালেই যেখানে বিশ্বকর্মা পুজো, ঠিক সেই একই দিনে ডুয়ার্সের ছোট্ট গ্রাম রামসাইয়ে পালিত হয় এক অনন্য হাতি পুজো। কর্মের দেবতার পুজোর পাশাপাশি এখানে পরম ভক্তিভরে পূজিত হন ‘মহাকাল বাবা’। স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের অটুট বিশ্বাস, বনের সেই গজরাজ বা হাতিকেই জাগ্রত দেবতা জ্ঞানে পুজো করে আসছেন গরুমারা জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন রামশাই-এর বাসিন্দারা।

ময়নাগুড়ি ব্লকের রামশাই গ্রাম পঞ্চায়েতের কাওয়াগাবাড়ি ও চ্যাংমারির মতো বনাঞ্চল ঘেরা গ্রামগুলিতে এই মহাকাল পুজো একটি সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে এই পুজোর নির্দিষ্ট কোনো তিথি না থাকলেও, রামশাইয়ের এই বিস্তীর্ণ এলাকায় বিশ্বকর্মা পুজোর দিনেই মহাকালের থানে পুজো দেওয়ার চিরাচরিত রীতি চলে আসছে। বছরের এই বিশেষ দিনে হাতিকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও নানা আচার দেখতে ডুয়ার্সের প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতির টানে ভিড় জমান বহু মানুষ।

শুধুমাত্র এই অভিনব রীতি মেনেই এই পুজো সীমাবদ্ধ নয়, এখানকার পূজিত মূর্তির রূপও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশাল এক হাতির পিঠে রাজবেশে আসীন এক পুরুষের প্রতিকৃতি এখানে দেখা যায়, যা মূলত বন্যপ্রাণ ও প্রকৃতির এক যৌথ শক্তির প্রতীক। গরুমারা জঙ্গল সীমানার এই জনপদের অধিকাংশ মানুষেরই রুটিরুজি নির্ভর করে কৃষিকাজের ওপর। কিন্তু বছরের বিভিন্ন মরশুমে জঙ্গল ছেড়ে হাতির দল লোকালয়ে হানা দিয়ে বিঘার পর বিঘা ধান ও ভুট্টার খেত নষ্ট করে দেয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাটির ঘরবাড়িও।

বুনো হাতির সেই তাণ্ডব থেকে নিজেদের কষ্টের ফসল ও জীবন বাঁচাতে ভয় আর শ্রদ্ধার এক অদ্ভুত মেলবন্ধনে গ্রামবাসী হাতিকে দেবতার আসনে বসিয়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের বিশ্বাস, নিষ্ঠাভরে ‘মহাকাল’বাবার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে গজরাজ শান্ত থাকবে এবং তাদের ক্ষেতের ফসলে আর পা দেবে না। ডুয়ার্সের প্রকৃতি ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই বিরল ও ঐতিহ্যবাহী রীতি দেখতে প্রতিবছরই কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে ওঠে রামশাইয়ে।

Aditi Banik
  • Aditi Banik