বিচার ব্যবস্থায় নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ! IAS অফিসারের বিরুদ্ধে সরাসরি হাইকোর্টের কোপে ক্ষুব্ধ বিচারক

প্রায় তিন দশক পুরোনো একটি জমি সংক্রান্ত আইনি বিবাদে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগে উত্তরপ্রদেশের এক সিনিয়র আইএএস কর্মকর্তা এবং দেবীপাতন বিভাগের কমিশনার দুর্গা শক্তি নাগপাল চরম আইনি বিপাকে পড়েছেন। এলাহাবাদ হাইকোর্টের লখনউ বেঞ্চ এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে এবং একজন দেওয়ানি বিচারককে করা ফোনকলটিকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার উপর সরাসরি ও নগ্ন আক্রমণ বলে তীব্র নিন্দা করেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অবমাননার অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য মামলাটি একটি উপযুক্ত বেঞ্চে অবিলম্বে স্থানান্তরিত করা হোক।

আইনি নথি ও প্রতিবেদন অনুসারে, আলোচিত মামলাটি জ্যোতি বিদ্যা মন্দির স্কুল এবং গোণ্ডা পৌর পরিষদের মধ্যে ১৯৯৭ সাল থেকে বিচারাধীন একটি সরকারি নাযুল জমি সংক্রান্ত বিরোধ। সিনিয়র ডিভিশনের দেওয়ানি বিচারক শাবিনা খান এই মামলাটির বিচারিক শুনানি করছিলেন। অভিযোগ উঠেছে যে, চলতি বছরের ১৫ই জুলাই বিভাগীয় কমিশনার দুর্গা শক্তি নাগপাল আচমকা তাঁকে ফোন করে ডেকে পাঠান। এরপর গত ৪ আগস্ট দেওয়ানি বিচারক শাবিনা খান গোণ্ডা জেলা জজকে একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়ে সমগ্র কথোপকথনের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানান। বিচারকের অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ফোনালাপে তাঁর ছুটির মেয়াদ এবং বিচারাধীন মামলাগুলি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছিল এবং প্রিসাইডিং অফিসারের ওপর অযাচিত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে মামলাটিকে নির্দিষ্ট দিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়।

বিচারক শাবিনা খানের ভাষ্যমতে, কথোপকথন চলাকালে তাঁর পেশাদার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং হাইকোর্টে কড়া অভিযোগ দায়ের করার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। বিচারক এটিকে নিজের পদের অপব্যবহার করে বিচার ব্যবস্থার ওপর বলপ্রয়োগ ও প্রভাব খাটানোর একটি নির্লজ্জ প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে মামলাটি অন্য আদালতে স্থানান্তরের জোরালো অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে জেলা জজ মহোদয় সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি গোণ্ডারই অন্য একটি উপযুক্ত আদালতে স্থানান্তর করেন।

অন্যদিকে, এই ঘটনায় কমিশনার দুর্গা শক্তি নাগপালের পক্ষ থেকেও নিজেদের বক্তব্য সামনে আনা হয়েছে। তিনি ফোন করার কথা অস্বীকার না করে জানিয়েছেন যে, গত এপ্রিলে দেবীপতন বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি এই পুরনো প্রশাসনিক মামলার কথা জানতে পেরেছিলেন। তাঁর দাবি, তিনি কেবল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং সরকারি আইনজীবীকে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৫ই জুলাইয়ের ফোন কলটি কেবল তাঁর ছুটির মেয়াদ ও কাজে ফেরার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য করা হয়েছিল এবং বিচারাধীন মামলা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলেই তাঁর দাবি।

বিচারপতি সৈয়দ কামার হাসান রিজভীর নেতৃত্বাধীন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, বিচারিক কর্মকর্তার বর্ণিত কথোপকথনের সুর ও ভাষা স্পষ্টভাবে বিচারককে প্রভাবিত করার অপচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। একটি বিচারাধীন মামলার বিষয়ে এভাবে সরাসরি ফোনে বিচারিক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা অত্যন্ত গুরুতর, উদ্বেগজনক এবং বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনের পরিপন্থী। আদালত সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, অধস্তন আদালতের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের কোনো প্রকার ভয়ভীতি, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ কিংবা প্রভাবমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার পূর্ণ অধিকার থাকতে হবে। আদালতের ওপর অযাচিত চাপ প্রয়োগের যেকোনো অপচেষ্টা বিচার প্রশাসনে বিপজ্জনক বাধা হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে হাইকোর্টের নির্দেশে বিষয়টি ফৌজদারি আদালত অবমাননা সংক্রান্ত বিশেষ বেঞ্চে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার ফলে এই আইনি লড়াই এখন আরও তীব্র মোড় নিতে চলেছে।