বাবা-মা জঙ্গলে আটকে! ১২ বছরের অবুঝ শিশুকে নেপাল বন্যার কোন মর্মান্তিক মিথ্যেটা বলে বাঁচিয়ে রেখেছেন পরিবারের লোকজন?

ক্যামেরার লেন্সের দিকে একদম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে সে। চারপাশের ভিড়, মানুষের ব্যস্ততা আর অজস্র ক্যামেরার ফ্ল্যাশ লাইট দেখে তার মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক। এত কাণ্ড কী নিয়ে হচ্ছে, তা নিয়ে তার ছোট্ট মনের কৌতূহলের যেন শেষ নেই। কিন্তু ঘরে উপস্থিত বাকি সকলে যে নির্মম সত্যটি সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত, ১২ বছরের অবুঝ নাবালক ছোট্ট তসেরিং তা ঘুণাক্ষরেও টের পাচ্ছে না।

তার মা কাম্মি এবং বাবা ফুরসাং—দু’জনের কেউই আর এই পৃথিবীতে বেঁচে নেই। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়ংকর বনাস্রোতে তলিয়ে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তারা দু’জনেই। কিন্তু সেই মর্মান্তিক ও কঠিন সত্যিটা এখনও জানানো হয়নি ছোট্ট তসেরিংকে। উল্টে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলা হয়েছে যে তার বাবা ও মা জঙ্গলের ভেতরে কোথাও বিপদে আটকে পড়েছেন। বন্যায় পাহাড়ি রাস্তাঘাট ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাঁদের ফিরতে হয়তো আরও এক বা দু’বছর সময় লাগবে।

পরিবারের এই মিষ্টি মিথ্যেকেই পরম সত্য বলে বিশ্বাস করে বাবা-মায়ের ফিরে আসার পথ চেয়ে দিন কাটাচ্ছে সে। উল্লেখ্য, গত ২৬ আগস্ট এক বিধ্বংসী বন্যায় কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় নেপালের রসুয়া এলাকার একাধিক জনপদ। নেপাল-তিব্বত সীমান্তের খুব কাছে হিমবাহের বিশাল বরফখণ্ড ও পাথরের চাঙড় ভেঙে হড়পা বানের মতো নদী উপত্যকার ওপর নেমে আসার পরই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ওই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে বহু মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বহু মানুষ। ধ্বংস হয়ে গেছে শত শত বসতি, যাতায়াতের রাস্তা এবং নদী পারাপারের সেতুগুলি। সেই ভয়াল বিপর্যয়ের গ্রাস থেকে বেঁচে ফেরা রসুয়ার বহু মানুষ বর্তমানে কাঠমান্ডুর একটি মঠে নিরাপদ আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

তাঁদেরই একজন হল এই দ্বাদশবর্ষীয় তসেরিং। এখন তার নিজের বলতে রয়েছে শুধু তার বড়মাসি মিনগমার দোলমা এবং বৃদ্ধা ঠাকুমা। চারপাশের মানুষজনকে যখনই সে কাঁদতে দেখে, অবুঝ তসেরিং কৌতূহলী হয়ে জানতে চায় তাঁরা কেন কাঁদছেন। কখনও আবার চারপাশের সেই কান্নার পরিবেশে সেও আনমনে সামিল হয়। কিন্তু যখনই সে বাবা-মায়ের কথা জানতে চায়, তখনই তার সামনে একটাই অজুহাত তুলে ধরা হয়—তারা জঙ্গলে গিয়েছেন এবং রাস্তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখনই তাঁদের ফেরা সম্ভব নয়।

তবে তসেরিংয়ের বড়মাসি মিনগমার দোলমা চোখের জল চেপে বুকের ভেতর চেপে রেখেছেন এক গভীর ক্ষত। তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন যে তসেরিংয়ের বাবা-মা আর কোনোদিনই ফিরে আসবেন না। কিন্তু এই কোমলমতি শিশুকে এত বড় ধাক্কা এখনই দিতে রাজি নন পরিবারের সদস্যরা।

রসুয়া থেকে বাস্তুহারা হয়ে প্রায় ৫২০ জন মানুষ এই মুহূর্তে কাঠমান্ডুর ওই মঠের ডরমেটরিতে আশ্রয় নিয়েছেন। মাথার ওপর থেকে ছাদ হারিয়ে এবং প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক বুকে চেপে মঠের ঠান্ডা ঘরেই নতুন করে জীবন শুরু করার কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।