বাঙালির হ্যালোইন! ভূত চতুর্দশীর রাতে কোন ১০ অতিপ্রাকৃত শক্তির মুখোমুখি হয় গ্রাম বাংলা?

ভূত চতুর্দশীর এই পবিত্র ও লোমহর্ষক সন্ধ্যায় চৌদ্দ শাক খাওয়া এবং চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন প্রথার মূল উদ্দেশ্য ছিল অশুভ শক্তি ও অতৃপ্ত আত্মাদের দূরে সরিয়ে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনা করা। সনাতন সংস্কৃতি ও গ্রাম বাংলার লোককথার এই বিশেষ রাতটিকে অনেকেই বাঙালির নিজস্ব ‘হ্যালোইন’ হিসেবেই গণ্য করে থাকেন। আর এই ভূত চতুর্দশীর আবহে বাংলার লোকসংস্কৃতিতে যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকা সেই সমস্ত কাল্পনিক ও অতিপ্রাকৃত চরিত্র বা ভূতের গল্প আজও মানুষের মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগায়। চলুন একনজরে জেনে নেওয়া যাক গ্রাম বাংলার আবহমান সংস্কৃতিতে চর্চিত এমন ১০টি জনপ্রিয় ও রহস্যময় ভূতের কথা।
তালিকায় সবার প্রথমে উঠে আসে ‘ব্রহ্মদৈত্য’-এর নাম। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ বর্ণের কোনো ব্যক্তির অপমৃত্যু ঘটলে তিনি ব্রহ্মদৈত্যে পরিণত হন। এদের পরনে সাধারণত ধুতি ও কাঁধে পবিত্র পৈতে থাকে এবং এরা স্বভাবগতভাবে অন্যান্য ভূতের তুলনায় শান্ত প্রকৃতির হয়ে থাকে। প্রাচীন বেলগাছ বা বটগাছে এদের বাস বলে মনে করা হয় এবং মানুষের ক্ষতি করার বদলে এরা অনেক সময় বিপদ-আপদে সাধারণ মানুষকে সাহায্যও করে থাকে। এরপরই রয়েছে ‘পেত্নী ও শাঁখচুন্নি’। অবিবাহিত অবস্থায় মনের ইচ্ছা অপূর্ণ রেখেই কোনো নারীর মৃত্যু হলে তিনি পেত্নী হন, যাঁদের পা উল্টো দিকে ঘোরানো থাকে এবং যাঁরা অত্যন্ত বদমেজাজি হন। অন্যদিকে, বিবাহিত হিন্দু নারীর অপমৃত্যু হলে তাঁরা শাঁখচুন্নির রূপ নেন। হাতে শাঁখা ও পরনে লাল পাড়ের শাড়ি পরিহিতা এই শাঁখচুন্নিরা মূলত বিবাহিত নারীদের ওপর ভর করে বা সুখী সংসার ভাঙার চেষ্টা চালায়।
তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে জলের ধারের বাসিন্দা ‘মেছো ভূত’। নাম শুনেই স্পষ্ট যে এই ভূতের মূল দুর্বলতা বা আকর্ষণ হলো মাছ। পুকুর, বিল বা জলাশয়ের ধারে এদের আস্তানা থাকে। রাতের বেলা নদী বা পুকুর থেকে মাছ ধরে কোনো মানুষ বাড়ি ফেরার সময় এরা পিছু নেয় এবং ভয় দেখিয়ে মাছ ছিনিয়ে নেয়। অনেক সময় মানুষের গলা নকল করে এরা “আমাকে মাছ দিবি না?” বলে আর্তনাদ করে পথচারীদের ভয় দেখায়। চতুর্থ স্থানে রয়েছে প্রবীণ গাছের বাসিন্দা ‘গেছো ভূত’। তেঁতুল, বট, শেওড়া গাছ বা বাঁশঝাড় এদের প্রিয় আস্তানা। গভীর রাতে হঠাৎ গাছের ডাল নাড়িয়ে বা পথচারীদের ওপর ঢিল ছুড়ে এরা আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পঞ্চম স্থানে থাকা ‘মামদো ভূত’ মূলত মুসলিম সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির অপমৃত্যু থেকে সৃষ্টি হয় বলে লোককথায় প্রচলিত। লম্বাটে ও ভয়ংকর চেহারার এই ভূতদের পায়ের পাতাও উল্টো দিকে ঘোরানো থাকে এবং এরা মূলত কবরস্থান বা নির্জন এলাকায় ঘুরে বেড়ায়।
ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে অত্যন্ত ভয়ংকর ‘স্কন্ধকাটা’। রেল দুর্ঘটনায় বা অন্য কোনো হিংসাত্মক উপায়ে যাঁদের মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাঁরা এই শ্রেণীতে পড়েন। এদের কাঁধের ওপর কোনো মাথা থাকে না, বরং বুক বা পিঠের মাঝখানে চোখ থাকে। এরা মূলত নিজেদের হারানো মাথা খুঁজে বেড়ায় এবং রাতের নির্জন রাস্তায় চলাচলকারী পথচারীদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। সপ্তম স্থানে থাকা ‘আলেয়া’ মূলত কোনো রক্তমাংসের ভূত নয়, বরং জলাভূমি বা ধানি জমির ওপর রাতের বেলা জ্বলে ওঠা রহস্যময় আলো। এই আলো দেখে বিভ্রান্ত হয়ে জেলেরা বা পথচারীরা পথ হারিয়ে জলাভূমিতে ডুবে প্রাণ হারান (যদিও বিজ্ঞান অনুযায়ী পচনশীল জৈব পদার্থ থেকে উৎপন্ন মিথেন গ্যাসের কারণে এর সৃষ্টি)। অষ্টম স্থানে রয়েছে কুখ্যাত ‘নিশি’। গভীর রাতে মানুষের পরিচিত কারোর গলা নকল করে নাম ধরে ডাকা এই ছলনাময়ীর মূল কাজ। লোকবিশ্বাস বলে, নিশির ডাকে সাড়া দিলে মানুষ সম্মোহিত হয়ে তার পেছনে চলে যায় এবং আর ফিরে আসে না। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী নিশি কখনো তিনবারের বেশি ডাকে না, তাই তিনবার ডাক শোনার পর দরজা খোলা নিষেধ।
নবম স্থানে রয়েছে ‘বেঘো ভূত ও কানাবুলা’। সুন্দরবন বা জঙ্গলসংলগ্ন এলাকায় বাঘের আক্রমণে যাঁদের মৃত্যু হয়, তাঁরা বেঘো ভূতে পরিণত হয়ে মানুষকে ভুল পথে বাঘের ডেরার দিকে টেনে নিয়ে যান। অন্যদিকে কানাবুলা বা ভুলো ভূত পথচারীদের চেনা রাস্তা গুলিয়ে দেয় এবং সারা রাত একই রাস্তায় ঘুরিয়ে মারতে পছন্দ করে। তালিকার দশম বা শেষ আকর্ষণ হলো ‘ডাইনি ও চুড়েল’। ডাইনিরা জীবিত নারী হলেও তাদের মধ্যে অলৌকিক ও অশুভ ক্ষমতার চর্চা থাকে বলে বিশ্বাস করা হয়। আর গর্ভাবস্থায় বা সন্তান প্রসবের সময় কোনো নারীর মৃত্যু হলে তাঁরা অত্যন্ত কুৎসিত ও ভয়ংকর রূপ নিয়ে চুড়েলের রূপ ধারণ করেন। তবে লোককথার এই সমস্ত চরিত্র ও বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবেই জনমানসের কল্পকাহিনি ও লোকসংস্কৃতির অঙ্গমাত্র। এশিয়ানেট নিউজ বাংলা কোনো ধরনের অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কারের প্রচার করে না, বরং গ্রামীণ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির লৌকিক উপাদান হিসেবেই এই বিষয়গুলিকে তুলে ধরা হয়েছে।