বাংলাদেশি ভেবে ভারতীয়কে পুশব্যাক! মোদি সরকারকে বিরাট হুঁশিয়ারি শশী থারুরের কমিটির!

ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণ নিয়ে কেন্দ্রকে চূড়ান্ত সতর্কবার্তা দিল সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কংগ্রেস সাংসদ তথা প্রাক্তন বিদেশ প্রতিমন্ত্রী শশী থারুরের নেতৃত্বে তৈরি এই প্যানেল স্পষ্ট জানিয়েছে যে, ভুল করে কাউকে বাংলাদেশি ভেবে সে দেশে দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। এই ধরনের পদক্ষেপের ক্ষেত্রে মোদি সরকারকে আরও অনেক বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের বাসিন্দা সোনালি খাতুন সহ বেশ কিছু ভারতীয় নাগরিককে ভুলবশত পুশব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনার প্রেক্ষাপটে এই সংসদীয় সুপারিশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরপসারি বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
বৃহস্পতিবার সংসদে পেশ করা এই গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্টে বলা হয়েছে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের কাজ এবং প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলি নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখতে ভারত ও বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে একটি পৃথক উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। সেই সঙ্গে, ঢাকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এবং পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দেশের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির সুনির্দিষ্ট পরামর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি অবিলম্বে আগের মতো স্বাভাবিক করার সুপারিশ করেছে কমিটি। বর্তমান ভারতীয় ভিসা নীতি নিয়ে গভীর পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে বলেও মনে করছে এই প্যানেল।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের দিক থেকে লাগাতার অনুপ্রবেশ আজও ভারতের অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে অসম, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরা রাজ্যে এখনও অবৈধ অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারকে সংশ্লিষ্ট সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিকে সঙ্গে নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর যৌথ রণকৌশল তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছে কমিটি। পাশাপাশি, দেশের সীমান্ত-নিরাপত্তার স্বার্থে যেকোনো কড়া পদক্ষেপ করার পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে যাদের আটক করা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ মানবিক আচরণ করার কথা বলা হয়েছে। ভারতের সংবিধানের মূল মর্ম এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের বিধিকে প্রাধান্য দিয়েই মোদি সরকারের এই বিষয়ে পদক্ষেপ করা উচিত বলে মত প্যানেলের।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তার স্বার্থে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে কমিটি। অতীতে সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া বা সাফটা চুক্তি কার্যকর থাকলেও, বর্তমানে এই চুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও তৃতীয় কোনো দেশের যোগসাজশে ভারতে বিপুল পরিমাণে সুতো ও অন্যান্য সামগ্রী ডাম্পিং করা হচ্ছে। এর ফলে দেশের দেশীয় শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে ভারতের উচিত বাংলাদেশের শীর্ষ বাণিজ্য মহল ও কূটনৈতিক স্তরে জোরালোভাবে বিষয়টি উত্থাপন করা।
দ্বিপাক্ষিক সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও সীমান্ত সুরক্ষার প্রসঙ্গে প্যানেলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ভাবাবেগ এবং পারস্পরিক সহমর্মিতাই দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি। সেই ঐতিহাসিক বোধকে আবারও পুনরুজ্জীবিত করতে দুই দেশকে যৌথ উদ্যোগে ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। এক দেশের যুবসমাজ ও তরুণ প্রজন্মকে অন্য দেশে নিয়ে গিয়ে পারস্পরিক মেলবন্ধনকে আরও দৃঢ় করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার মোট ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্তের মধ্যে এখনও প্রায় ৮৬৪ কিলোমিটার এলাকা উন্মুক্ত রয়েছে, যা সুরক্ষার ক্ষেত্রে বড় ফাঁক তৈরি করছে। অবিলম্বে বাকি অংশেও কাঁটাতার বসানোর কাজ সম্পূর্ণ করার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে এই রিপোর্টে।