প্রাণ বাঁচাতে ভারতের পায়ে লুটিয়ে পড়ল ইরান! আরব সাগরের ত্রাতা হয়ে কোন মহাবীরত্ব দেখাল ভারত?

আরব সাগরের বুকে এক রোমহর্ষক ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের কবল থেকে ইরানের ২০ জন জিম্মি নাবিককে নিরাপদে উদ্ধার করল ভারতীয় নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। মুম্বই থেকে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরে গভীর সমুদ্রে সংঘটিত এই দুঃসাহসিক অপারেশনের ফলে এক বড়সড় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ইরানের মাছ ধরার ভেসেল ‘আজিনি’ হঠাৎই সশস্ত্র জলদস্যুদের দখলে চলে যাওয়ার পর থেকেই চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর তৎপরতা ও নিখুঁত সমন্বয়ের জেরে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার একটানা সমন্বিত অভিযানে সমস্ত বন্দি নাবিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে যখন সোমালিয়ার উত্তর-পূর্ব উপকূলের কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইরানি ভেসেলটি জলদস্যুদের কবলে পড়ে। অত্যন্ত বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, ছিনতাই হওয়া ওই জলযানটিকে জলদস্যুরা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বড় বাণিজ্যিক জাহাজগুলিতে আক্রমণের প্রধান ‘মাদার শিপ’ বা মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করার ফন্দি এঁটেছিল। বিষয়টি নজরে আসতেই বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে রেসপন্স করে ভারতীয় নৌবাহিনী। আরব সাগরের নির্দিষ্ট এলাকায় একটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ এবং উন্নত নজরদারি বিমান মোতায়েন করা হয়। স্যাটেলাইট ও রাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে একটানা নজরদারি চালিয়ে দ্রুত জাহাজটির সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা হয় এবং এর গতিবিধি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে ভারতীয় বাহিনী।

এর পরেই অপারেশনের সবচেয়ে রোমহর্ষক ও কৌশলগত ধাপটি বাস্তবায়িত হয়। ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি সুবৃহৎ সি-১৭ গ্লোবমাস্টার বিমান থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্যারাশুটের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রে নামানো হয় প্রশিক্ষিত এবং অত্য়ন্ত নির্ভীক মেরিন কমান্ডোদের (MARCOS)। জলদস্যুরা ভারী অস্ত্রে সজ্জিত থাকা সত্ত্বেও ভারতীয় কমান্ডোদের অভাবনীয় রণকৌশল ও মানসিক শক্তির সামনে তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে অভিযান চালিয়ে জলদস্যুদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করা হয় এবং বন্দি ইরানি নাবিকদের সম্পূর্ণ সুরক্ষিত অবস্থায় মুক্ত করা হয়। স্বস্তির বিষয় হলো, এত বড় একটি রক্তক্ষয়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে কোনো রকম হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

এই বিরাট সাফল্যের পর নয়াদিল্লিতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস ভারত সরকারের পাশাপাশি নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর ভূমিকার উচ্চ প্রশংসা করে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়েছে। দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি টুইট বার্তায় স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর অতুলনীয় পেশাদারিত্ব, সাহসিকতা এবং কার্যকর সমন্বয় আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসনীয়। এই সফল উদ্ধার অভিযান কেবল মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ ত্রাণের ক্ষেত্রে ভারতের দৃঢ় অঙ্গীকারেরই পরিচয় বহন করে না, বরং জলপথে সীমানা পেরিয়ে জীবন রক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পাশাপাশি, এটি ভারত ও ইরানের মধ্যকার সুদীর্ঘকালের বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সংহতি ও সহযোগিতার মনোভাবকে আরও বহুগুণ মজবুত করেছে।

দেশের এই বীর জওয়ানদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। তিনি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ভারতীয় নৌবাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ৪৮ ঘণ্টার অপারেশন চালিয়ে আজিনি জাহাজের প্রতিটি নাবিককে উদ্ধার করেছে। বিমানবাহিনীর সময়োপযোগী লজিস্টিক ও কৌশলগত সহায়তা এই সাফল্যের পথ প্রশস্ত করেছিল। উল্লেখ্য, সোমালীয় উপকূল থেকে আরব সাগর পর্যন্ত সামুদ্রিক বাণিজ্যপথগুলিতে জলদস্যুদের উপদ্রব অতীতে বারবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ভারতীয় নৌবাহিনী বিগত কয়েক বছরে একের পর এক সফল অপারেশন চালিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছে যে, সুদূর সমুদ্রসীমায় অপরাধ দমন এবং আন্তর্জাতিক জলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভারত সর্বদা এক নম্বরে রয়েছে। এই সফল অভিযান কেবল ইরানি নাবিকদের পরিবারের মুখে হাসি ফোটায়নি, বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতের নিরাপত্তা রক্ষাকারী ভূমিকাটিকে আরও এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।