‘প্রযুক্তি যুদ্ধ জেতাতে পারে না, আসল চাবিকাঠি অন্য!’ সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠের মন্তব্যে তোলপাড় কৌশলগত মহল

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যুদ্ধক্ষেত্রের চরিত্র এবং লড়াইয়ের কৌশল রাতারাতি বদলে যাচ্ছে। যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, দীর্ঘমেয়াদি ও সামগ্রিক যুদ্ধের বাস্তব প্রেক্ষাপটে স্থলভাগে সরাসরি বিজয় অর্জনই যে সবচেয়ে বড় মাপকাঠি—রবিবার এনডিটিভি ডিফেন্স সামিটে প্রথমবার বক্তব্য রাখতে গিয়ে এমনই জোরালো বার্তা দিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ। আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা এবং তথ্যের বিভ্রান্তির যুগে দাঁড়িয়েও যুদ্ধের প্রকৃত বাস্তবতা এবং আত্মনির্ভরতার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন তিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ার বিভ্রান্তি বনাম বাস্তব: বর্তমান জমানার যুদ্ধের চিত্র তুলে ধরে সেনাপ্রধান বলেন, ‘‘আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের যুদ্ধের নানা দৃশ্য ও খবর ক্রমাগত দেখতে পাই। সেখানে তথ্যের বয়ান ও প্রচারের মাধ্যমে যুদ্ধের প্রকৃত চিত্রকে অনেক সময় অস্পষ্ট করে তোলা হয়। এর ফলে অনিশ্চয়তা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়।’’ তবে এই সমস্ত কোলাহলের মাঝেও একটি চিরন্তন সত্য অপরিবর্তিত থাকে বলে মত প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে ভূখণ্ডই সর্বদা একমাত্র দৃশ্যমান ও কার্যকর উপাদান। অতীতে ভূখণ্ডের নিরিখেই বিজয় পরিমাপ করা হয়েছে, বর্তমানেও হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে। আর সেই ভূখণ্ড দখল, সুরক্ষিত রাখা ও রক্ষা করার কাজ কেবল সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমেই সম্ভব।’’
সক্ষমতার কেন্দ্রে সৈনিক এবং ‘বিরতিসহ যুদ্ধ’: সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় সাধারণ সৈনিককে রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন জেনারেল শেঠ। তাঁর মতে, কোনো সক্ষমতা অর্জনের পরিকল্পনা করার সময় এই প্রশ্নটি অবশ্যই মাথায় রাখা দরকার যে, তা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করা সৈনিককে কতটা সাহায্য করছে।
বর্তমান সহস্রাব্দের যুদ্ধগুলিকে ‘বিরতিসহ যুদ্ধ’ বা ‘Wars with Pause’ হিসেবে বর্ণনা করে সেনাপ্রধান জানান যে, প্রযুক্তি লড়াইয়ের নির্দিষ্ট সময়কাল কমিয়ে আনলেও সামগ্রিক যুদ্ধের সময়কাল যে কমছে, তা নিশ্চিত নয়। মাঝে মাঝেই তীব্র লড়াইয়ের ঘটনা ঘটলেও এই বিরতি সংঘাতের অবসান ঘটায় না, বরং লড়াইয়ের তীব্রতা ও প্রকাশের ধরন বদলে দেয়।
আত্মনির্ভরতা এবং ‘দেশীয় প্রযুক্তির অচল হয়ে পড়া’র ফাঁদ: সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে আত্মনির্ভরতাই যে বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে মূল পার্থক্য গড়ে দেয়, সেকথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন সেনাপ্রধান। তাঁর মতে, অন্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘দেশীয় প্রযুক্তির অচল হয়ে পড়া’ বা ‘Indigenous Obsolescence’-এর ফাঁদ এড়ানো। অর্থাৎ, নিজের দেশের প্রযুক্তিতে তৈরি কোনো ব্যবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের আগেই যাতে সেকেলে না হয়ে পড়ে, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে হবে। সব মিলিয়ে, সেনাপ্রধানের এই বিশ্লেষণ আধুনিক সামরিক কৌশলের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দূরদর্শী ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।