পুরুষ বিধবা! মুর্শিদাবাদে ভাতার টাকা তুলতে গিয়ে যা সামনে এল, তা জানলে মাথায় হাত পড়বে আপনারও!

পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দুর্নীতির বেনজির ও চাঞ্চল্যকর চিত্র প্রকাশ্যে এল। রাজ্যে ক্ষমতাসীন সরকারের জমানার নানা ত্রুটিপূর্ণ ও ভুলের খতিয়ান তুলে ধরার মাঝেই এবার মুর্শিদাবাদের লালগোলা ব্লকের পণ্ডিতপুর বাগানপাড়া এলাকা থেকে এক অবিশ্বাস্য ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে সরকারি খাতায় খোঁজ মিলেছে এক ‘পুরুষ বিধবা’র! বছর পাঁচেক আগে স্বামীহারা হওয়া মানসিক ভারসাম্যহীন এক অসহায় মহিলার প্রাপ্য বিধবা ভাতার টাকা দিনের পর দিন বঞ্চিত করে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ঢুকছে এলাকারই এক যুবকের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। এই গুরুতর জালিয়াতি ও প্রশাসনিক গাফিলতির ঘটনাটি জানাজানি হতেই গোটা এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় বিগত বেশ কিছুদিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন থেকে শুরু করে থানা-পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ালেও আজ পর্যন্ত কোনো সুরাহা মেলেনি বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, লালগোলা ব্লকের পণ্ডিতপুর বাগানপাড়া এলাকার বাসিন্দা রোহেনা বিবি প্রায় পাঁচ বছর আগে তাঁর স্বামীকে হারিয়ে সম্পূর্ণ একা ও অসহায় হয়ে পড়েন। প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোহেনা মানসিকভাবে কিছুটা ভারসাম্যহীন এবং তাঁর জীবনধারণের জন্য ন্যূনতম কোনো নিজস্ব উপার্জনের সুব্যবস্থা নেই। পরিবারের চরম অনটন ও দুঃসময়ের কথা চিন্তা করেই তিনি নিয়ম মেনে সরকারি ‘বিধবা ভাতা’ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সেই আবেদন মঞ্জুর হয় এবং ভাতার টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ করা শুরুও হয়। কিন্তু সবথেকে বড় ট্র্যাজেডি হলো, সেই ভাতার একটি কানাকড়ির টাকাও আজ পর্যন্ত রোহেনা বিবির নিজের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এসে পৌঁছায়নি। বরং তদন্তে ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে যে, রোহেনার প্রাপ্য সেই মাসিক ভাতার টাকা অত্যন্ত সুকৌশলে জমা হচ্ছিল এলাকারই অপর এক বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম নামের এক যুবকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে।
বিষয়টি প্রথম নজরে আসার পরই ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৪ সালে, যখন প্রথমবার এই বড় ধরনের গরমিল ও জালিয়াতির বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। এরপর থেকেই সুবিচার এবং নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আশায় রোহেনা বিবির পরিবার প্রশাসনিক দপ্তরে ও থানায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করে। এলাকার বাসিন্দা মুসাদুকুর আলম জানিয়েছেন যে, এই অনিয়মের বিষয়ে যখন প্রথম বিডিও (BDO) অফিসে যোগাযোগ করা হয়, তখন দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা তাঁদের কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়ে কেবল বিভিন্ন অজুহাতে দিনের পর দিন ঘোরাতে থাকেন। বাধ্য হয়ে স্থানীয় থানায় অভিযোগ জানানো হলেও সেখান থেকেও কোনো ইতিবাচক সাহায্য মেলেনি। এমনকি বিষয়টি মীমাংসার জন্য একাধিকবার স্থানীয় স্তরে সালিশি সভার আয়োজন করা হলেও শেষ পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। উলটোদিকে, অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যম বা স্থানীয়দের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে, তিনি সম্পূর্ণ মুখ বন্ধ রাখেন এবং কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।
সাধারণ মানুষের মনে সবথেকে বড় যে প্রশ্নটি বারবার ঘুরেফিরে আসছে, তা হলো—কীভাবে এত বড় এবং স্পষ্ট একটি ভুল বা জালিয়াতি বছরের পর বছর ধরে প্রশাসনের কড়া নজর এড়িয়ে বহাল তবিয়তে চলতে পারল? একদিকে যখন পেটে ভাত না থাকা প্রকৃত বিধবা মহিলা রোহেনা বিবি চরম দারিদ্র্য ও অনটনের মধ্যে দিয়ে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই অন্য একজন সক্ষম যুবকের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে প্রতিমাসে সরকারি অনুদানের টাকা ঢুকে যাওয়ার এই ঘটনা প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপর এক বিশাল কালো দাগ ফেলে দিয়েছে। স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একাংশের মতে, এই ঘটনায় জড়িত রাঘববোয়ালদের খুঁজে বের করে অবিলম্বে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে সাধারণ মানুষের সরকার ও প্রশাসনের প্রতি আস্থা চিরতরে ভেঙে পড়বে। বর্তমানে গোটা লালগোলা জুড়ে এই অদ্ভুত ‘পুরুষ বিধবা’ কাণ্ডকে কেন্দ্র করে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।