পাহাড়ের কোল থেকে এল চরম ধাক্কা! গঙ্গার পবিত্র শহরেও বিষাক্ত হচ্ছে বাতাস, তালিকায় কোন বড় নাম?

ঋষিকেশ মানেই আধ্যাত্মিকতার এমন এক পবিত্র ভূমি, যেখানে পা রাখতেই মন ও অন্তরাত্মা শান্ত হয়ে যায়। কোলের কাছে বয়ে চলা মা গঙ্গা এবং মাথার ওপর সুউচ্চ হিমালয়ের পাহাড়ি পাহারা এই শহরটিকে এক অনন্য ও স্বর্গীয় সৌন্দর্য দান করেছে। যুগ যুগ ধরে এই শহরটিকে একটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন এবং পবিত্র জনপদ হিসেবেই চেনা হয়ে আসছে, কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক নিয়মগুলো একে সর্বদা পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বাতাসে দূষণের মাত্রা এবং পরিচ্ছন্নতার যে নতুন র‍্যাঙ্কিং বা তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে চারধাম যাত্রার এই প্রধান প্রবেশদ্বার ১৬তম স্থানে অবস্থান করছে।

এমতাবস্থায় সবচেয়ে বড় এবং চিন্তার প্রশ্ন হলো— যে শহরের শিরায়-উপশিরায় হিমালয়ের খাঁটি ও জাদুকরি বাতাস বয়ে চলে, সেই স্বর্গীয় শহরটি বাতাসের এই বিশুদ্ধতার লড়াইয়ে হঠাৎ এত পিছিয়ে পড়ল কেন? প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় পবিত্রতার বিচারে তো এর তালিকার একেবারে শীর্ষস্থানে অর্থাৎ প্রথম पायদান-এ থাকার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। কিছু আধুনিক বাধ্যবাধকতা এবং অতিরিক্ত জনস্রোতের চাপ আজ এই পবিত্র দেবভূমিকে চরম মূল্য চোকাতে বাধ্য করছে। প্রতি বছর বিশ্বের কোণায় কোণায় থেকে লক্ষ লক্ষ দেশি-বিদেশি পুণ্যার্থী, সাধু-সন্তু এবং অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। হাজার হাজার পর্যটকবাহী গাড়ি ও যানের কালো ধোঁয়া এই শান্ত উপত্যকার নির্মল বাতাসকে দিন দিন ভারী ও দূষিত করে তুলছে। পাহাড় কেটে রাস্তা প্রশস্ত করার ধুম এবং অনিয়ন্ত্রিত ও অপরিকল্পিত শহুরে রূপান্তর কোথাও না কোথাও গিয়ে এই পবিত্র জনপদের বাতাসে ধুলোবালি ও বিষাক্ত উপাদান মিশিয়ে দিচ্ছে।

সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ড বা কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে সর্বশেষ র‍্যাঙ্কিং তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছে, তাতে তিন লক্ষেরও কম জনসংখ্যা বিশিষ্ট দেশের মোট ৪০টি শহরকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ তালিকাটিতে উত্তরাখণ্ডের আধ্যাত্মিক শহর ঋষিকেশের স্থান হয়েছে ১৬ নম্বরে। এই তালিকায় তালিকার একেবারে প্রথম স্থানটি দখল করে রয়েছে ওড়িশার শিল্পশহর কালিনগর, যার দূষণ নিয়ন্ত্রণ স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৯৮.৫। এছাড়া এই তালিকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানটিও ওড়িশারই দুটি অঞ্চলের দখলে রয়েছে— যেখানে অঙ্গুল সিটির স্কোর ১৯৬.৫ এবং তালচের সিটির স্কোর ১৯৩.৫ রেকর্ড করা হয়েছে।

ঋষিকেশে সারা বছরই দেশ-বিদেশ থেকে অগণিত মানুষ মানসিক শান্তি, আধ্যাত্মিক ধ্যান এবং যোগসাধনা শিখতে আসেন। এই শহরে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পবিত্র গঙ্গা নদী এবং চারপাশের সুবজ পরিবেশকে রক্ষা করার জন্য এখানে প্লাস্টিকের ব্যাগ এবং যেকোনো ধরনের ওয়ান-টাইম বা ডেসপোজেবল পাত্র ব্যবহারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এছাড়া এখানকার নির্দিষ্ট অঞ্চলে মাংস এবং মদ্যপানের ওপর সম্পূর্ণ আইনি ও সামাজিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এত কড়াকড়ি এবং পরিবেশ রক্ষার শত চেষ্টার পরেও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত সাম্প্রতিক বাতাসের বিশুদ্ধতার তালিকায় যোগশহর ঋষিকেশ কেন ১৬তম স্থানে নেমে গেল, তা নিয়ে এখন পরিবেশবিদ মহলে শুরু হয়েছে গভীর চিন্তাভাবনা।