নেপাল থেকে ভেসে আসা মাছ খেলেই মারাত্মক বিপদ! বিহার সরকারের জরুরি সতর্কবার্তায় থরহরি কম্প

নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলের জেরে বিপর্যস্ত পরিস্থিতি এখন ভারতের বিহার রাজ্যেও। ত্রিশূলী নদীর চলোচ্ছ্বাস গণ্ডক ও কোশী নদীর মাধ্যমে প্রবেশ করে বিহারের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলিতে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে শুধু প্লাবনই সৃষ্টি হয়নি, বরং জলের সঙ্গে ভেসে আসছে প্রচুর পরিমাণে অপরিচিত ও অজানা প্রজাতির মাছ, আবর্জনা এবং পশুর মৃতদেহ। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে অবিলম্বে সতর্কতা জারি করেছে বিহার সরকার। প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদ বিভাগ সাফ জানিয়েছে যে, বন্যার জলে ভেসে আসা এই মাছ খাওয়া মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পয়ঃনিষ্কাশন নালার দূষণ, মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস এবং অন্যান্য ক্ষতিকারক রোগজীবাণু বহন করে এই মাছগুলি। নেপাল পুলিশও স্থানীয় নাগরিকদের জন্য একই রকম নির্দেশিকা জারি করেছে। সরকারের নির্দেশিকায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, বন্যার সময় পুকুর ও হ্রদের মাছ জলাধার থেকে বেরিয়ে প্লাবিত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মৃত প্রাণী এবং পয়ঃনালার দূষিত জলের সংস্পর্শে আসায় এই মাছগুলি সম্পূর্ণ বিষাক্ত ও খাওয়ার অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই মাছগুলি ধরা, কেনা, বিক্রি করা বা খাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের সুরক্ষার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অপরিচিত বা অস্বাভাবিক দেখতে যে কোনো মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকার আর্জি জানানো হয়েছে। এ ধরনের মাছ খাওয়ার পর যদি বমি, ডায়রিয়া, পেটে ব্যথা, মাথা ঘোরা কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে কালবিলম্ব না করে অবিলম্বে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও কোনো অস্বাভাবিক বা মৃত মাছ নজরে এলে দ্রুত স্থানীয় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বা প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নেপালের বন্যা কেবল মাছ নয়, সঙ্গে নিয়ে এসেছে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসলীলা। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস ও হিমবাহ ফেটে যাওয়ার ফলে পলি, কাদা, পাথর এবং বিশালাকার গাছের গুঁড়ির পাশাপাশি ভেসে আসছে গাড়ি, গৃহস্থালীর আসবাবপত্র এবং এলপিজি সিলিন্ডারের মতো জিনিসপত্র। সেই সঙ্গে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ জলের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় রাজ্যে মারাত্মক সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই দূষিত বন্যার জল যদি নলকূপ বা কুয়োর পানীয় জলের সঙ্গে মিশে যায়, তবে ডায়রিয়া, কলেরা এবং টাইফয়েডের মতো মারণ রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া হেপাটাইটিস এ এবং ই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে ভূগর্ভস্থ জলের বিষাক্ততা। নেপাল-সংলগ্ন পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, সীতামাড়ি, কিষাণগঞ্জ, পূর্ণিয়া এবং আরারিয়া জেলার ভূগর্ভস্থ জলে ইতিমধ্যেই আর্সেনিকের মাত্রা নিরাপদ সীমার অনেক ওপরে রয়েছে। পাশাপাশি, এই জেলাগুলিতে জলে আয়রনের মাত্রা অতিরিক্ত বেশি থাকায় তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কিষাণগঞ্জে আয়রনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। সার্বিক এই জলসংকট এবং বন্যার প্রকোপে বিহারের সীমান্তবর্তী জেলাগুলির কৃষিজমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আগামী দিনে খাদ্যশঙ্কা ও কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।