নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পরেও চাকরি বাতিল! বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের মেগা দুর্নীতিতে ফুঁসছে রাজ্য

চাকরির সমস্ত ধাপ সফলভাবে পেরিয়ে, পরীক্ষা ও ইন্টারভিউয়ের গণ্ডি টপকে, খোদ হাতে নিয়োগপত্র পাওয়ার পরেও রাতারাতি সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল হয়ে যাওয়ার এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে পূর্ব বর্ধমান জেলার প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (ICMR-DHR-VRDL)-এর আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কর্মী নিয়োগের এই ঘটনায় চাকরিপ্রার্থীদের একাংশ তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, প্রশাসনিক বা প্রযুক্তিগত কোনো কারণ নয়, বরং শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীদের তীব্র রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং নিজ দলের পছন্দের লোকজনকে ব্যাকডোরে ঢোকানোর হীন উদ্দেশ্যেই এই পুরো প্যানেলটি সুপরিকল্পিতভাবে বাতিল করা হয়েছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে সায়েন্টিস্ট-বি (মেডিক্যাল ও নন-মেডিক্যাল), ল্যাব টেকনিশিয়ান, ডেটা এন্ট্রি অপারেটর এবং মাল্টি টাস্কিং স্টাফের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদগুলিতে নিয়োগের উদ্দেশ্যে পূর্বে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল, যার মেমো নম্বর ছিল BMC/2675। কঠোর নিয়মকানুন ও স্বচ্ছতার সঙ্গে নথি যাচাই, লিখিত পরীক্ষা এবং ইন্টারভিউয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর একটি চূড়ান্ত মেধাতালিকা বা প্যানেল প্রকাশিত হয়। শুধু তাই নয়, নির্বাচিত সফল প্রার্থীদের হাতে BMC/3104, BMC/3109, BMC/3110 ও BMC/1011 ইত্যাদি একাধিক অফিশিয়াল মেমো নম্বরের মাধ্যমে পাকা নিয়োগপত্র বা অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রার্থীরা যখন কাজে যোগ দেওয়ার দিন গুনছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই গত ৫ নভেম্বর প্রকাশিত এক নতুন নির্দেশিকায় পুরো প্যানেলটি আচমকাই বাতিল ঘোষণা করা হয়।

হাতে নিয়োগপত্র পাওয়ার পরও এই ধরনের আকস্মিক সিদ্ধান্তে প্রার্থীরা চরম মানসিক হতাশায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের ক্ষোভ, নিয়োগের প্রতিটি স্তরে যখন কোনো ধরনের নিয়মভঙ্গের বা কারচুপির অভিযোগ খোদ কর্তৃপক্ষ তোলেননি, তখন হঠাৎ কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো? চাকরিপ্রার্থীদের জোরালো অভিযোগ, বিশেষ করে নীচের সারির পদগুলিতে নিজেদের দলীয় ক্যাডার ও পছন্দের লোকজনকে জোর করে বসানোর জন্য শাসকদলের নেতারা প্রিন্সিপালের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। সেই রাজনৈতিক ও অশুভ চাপের কাছে মাথানত করেই তড়িঘড়ি গোটা প্যানেল বাতিল করা হয়েছে। ন্যায়বিচারের দাবিতে ভুক্তভোগী প্রার্থীরা ইতিমধ্যেই সরাসরি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, জেলাশাসক এবং বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের দপ্তরে লিখিত ই-মেল ও স্মারকলিপি জমা দিয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের সিবিআই বা বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

এই ঘটনায় রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে। বিরোধীরা একযোগে শাসক শিবিরকে কাঠগড়ায় তুলে আক্রমণ শানিয়েছেন। যদিও বিজেপির জেলা সভাপতি আশিস কুমার পাল সমস্ত অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির দূরদূরান্তের কোনো যোগ নেই এবং অধ্যক্ষ যদি কোনো বেআইনি কাজ বা ভুল করে থাকেন, তবে তার সম্পূর্ণ দায় তাঁকেই নিতে হবে। অন্যদিকে, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল সব্যসাচী দাস টেলিফোন মারফত সাফাই দিয়ে দাবি করেছেন যে, সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কিছু ‘টেকনিক্যাল ভুল’ বা কারিগরি ত্রুটি থাকার কারণে কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাধ্য হয়েই প্যানেলটি বাতিল করতে হয়েছে। তবে খুব শীঘ্রই নতুন করে সংশোধিত নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করলেও ক্ষুব্ধ চাকরিপ্রার্থীদের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি এই সাফাই।