“দু’বার মৃত্যুকে হারিয়ে ফিরে আসা!”-ভারতীয় পাইলট স্মিত আজ কোন উচ্চতায়?

মাথার পিছনে গভীর ক্ষত, সুতোর সেলাইয়ে ঢাকা চামড়া। বাঁ হাত স্লিংয়ে বাঁধা আর ডান হাতে মোটা ব্যান্ডেজ— ভারতীয় পাইলট স্মিত মচ্ছরের শরীরের প্রতিটি ক্ষতচিহ্ন যেন মাঝআকাশের সেই নৃশংস হামলার জীবন্ত দলিল। সহ-পাইলটের কুঠারের আঘাতে ককপিটে যেভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি, সেই ভয়াবহতা নতুন করে সামনে এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির (UAE) প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের একটি ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর। মাথার সেই বিভীষিকাময় ক্ষত দেখে খোদ প্রেসিডেন্টও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

গত ২৮ অক্টোবর ফ্লাইদুবাইয়ের সেই দুঃসাহসী পাইলট স্মিত মাচ্ছর এবং তাঁর ক্রু সদস্যদের দেশের অন্যতম সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘ফার্স্ট ক্লাস অর্ডার অফ জায়েদ II’-এ ভূষিত করা হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ‘FZ1073’ ফ্লাইটে মাঝআকাশে ঘটে যাওয়া সেই রোমহর্ষক পরিস্থিতিতে যাত্রীদের জীবন বাঁচাতে তাঁরা যে সাহসিকতা দেখিয়েছিলেন, তারই স্বীকৃতিস্বরূপ এই সম্মান দেওয়া হয়।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান স্মিতের পিঠ চাপড়ে বলেন, “সুস্থ হয়ে উঠলে আপনাকে লড়াই শেখানোর জন্য একটি বিশেষ জিউ-জিৎসু সেশন করতে চাই।” প্রেসিডেন্টের এমন প্রস্তাব শুনে হেসে ফেলে স্মিত জানান, এটি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি ও সম্মান।

চিকিৎসকদের চোখে ‘মিশন ইমপসিবল’, কতটা গুরুতর ছিল আঘাত?

স্নায়ুশল্য চিকিৎসকদের মতে, স্মিতের মাথার পিছনের অংশে যে ক্ষতচিহ্ন রয়েছে, তা সাধারণ কোনো আঘাত নয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘কমপাউন্ড ডিপ্রেসড স্কাল ফ্র্যাকচার’ (Compound Depressed Skull Fracture)। অর্থাৎ, কুঠারের আঘাতে তাঁর মাথার খুলির হাড় ভেঙে সরাসরি ভিতরের দিকে ঢুকে গিয়েছিল।

আমেরিকার বিশিষ্ট স্নায়ুশল্য চিকিৎসক ডাঃ সনৎ দীক্ষিতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ধরনের মারাত্মক চোটে মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা ভেতর থেকে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি সর্বদাই থাকে। খুলির ওই সংবেদনশীল অংশের পাশেই রয়েছে মস্তিষ্কের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিরা। অস্ত্রোপচারের সময়ে সামান্য ভুল হলেই বিপুল রক্তক্ষরণে মৃত্যু বা স্থায়ী পক্ষাঘাতের ঝুঁকি ছিল প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি! বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাঙা হাড়ের টুকরো সরানোর সময় অনিয়ন্ত্রিত রক্তক্ষরণে প্রতি মিনিটে প্রায় দুই লিটার পর্যন্ত রক্ত বেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সেই মারাত্মক পরিস্থিতিকে জয় করেই চিকিৎসকদের সহায়তায় বেঁচে ফেরেন এই বীর পাইলট।

কী ঘটেছিল সেই অভিশপ্ত দিনে?

তদন্তে জানা গিয়েছে, ফ্লাইটের সহ-পাইলট হামাম আল-হাম্মামি হঠাৎই কুঠার নিয়ে স্মিতের ওপর চড়াও হন। প্রথমে স্মিত ভেবেছিলেন বিমানের কোনো ভারী যন্ত্রাংশ বোধহয় ভেঙে তাঁর মাথায় পড়েছে। কিন্তু রক্তে দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসার পরই তিনি বুঝতে পারেন চরম বিপদের কথা। ওই অবস্থাতেও নিজের জীবনের পরোয়া না করে, বিমানটিকে রক্ষা করতে এবং পিছনের ১৮০ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচাতে কোনোমতে ককপিটের দরজা খুলে দেন তিনি। আর সেই মুহূর্তটিই হয়ে দাঁড়ায় ফ্লাইট বিপর্যয় থেকে বেঁচে ফেরার একমাত্র ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

দু’বার মৃত্যুকে হারিয়ে, সাহসিকতা ও মনের জোরের জোরে আজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছেন এই ভারতীয় হিরো।