থরে থরে সাজানো কোটি কোটি টাকা! ঘুষ নিয়ে রায় দিতেন? হাতেনাতে ধরা পড়লেন হাইকোর্টের এই বিচারপতি

দিল্লির অভিজাত তুঘলক ক্রিসেন্টের ৩০ নম্বর সরকারি বাংলোটি বাইরে থেকে যতটাই শান্ত দেখাত, ২০২৫ সালের ১৪ মার্চের সেই কালরাতের অগ্নিকাণ্ড ততটাই এক শিহরণজাগানো ও অভূতপূর্ব সত্যকে প্রকাশ্যে এনে দিয়েছিল। আগুন নেভাতে গিয়ে দমকলকর্মীরা ধোঁয়ার আড়ালে যা দেখেছিলেন, তা সাধারণ মানুষের সমস্ত কল্পনাকে হার মানায়—স্টোররুমে থরে থরে সাজানো ৫০০ টাকার নোটের পাহাড়! সেই এক রাতের আবিষ্কার পুরো দেশের বিচার ব্যবস্থাকে সঙ্কেতের মুখে ফেলে দিয়েছিল।
অবশেষে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা গঠিত তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি তাদের চূড়ান্ত রিপোর্টে জানিয়ে দিয়েছে—তৎকালীন দিল্লি হাইকোর্ট এবং পরবর্তীকালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি ও অসদাচরণের তিনটি অভিযোগই নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
১. বিচারপতির সাফাই ও কমিটির কড়া অবস্থান
ঘটনার পর থেকেই দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে বিচারপতি যশবন্ত বর্মা দাবি করেছিলেন যে, ওই স্টোররুমটি সরাসরি তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল না এবং অগ্নিকাণ্ডের সময় তিনি সেখানে উপস্থিতও ছিলেন না। তবে তদন্ত কমিটি তাঁর এই সমস্ত যুক্তি ও সাফাই সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে।
রিপোর্টে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, যে সরকারি প্রাঙ্গণে রাশি রাশি নগদ টাকা পাওয়া গিয়েছিল, তা বিচারপতির প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানিয়েছে, সেখানে কয়েকটি ছিটেফোঁটা নোট নয়, বরং সুবিন্যস্তভাবে রাখা ছিল টাকার বান্ডিল ও স্তূপ। কিন্তু এত বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস কী? এর আসল মালিকই বা কে কিংবা কেন তা ওই স্টোররুমে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?—এই মৌলিক প্রশ্নগুলির একটিরও কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি অভিযুক্ত বিচারপতি। তদন্তকারী প্যানেল তাঁর এই অবস্থানকে “এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা, অসম্পূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর” বলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে।
২. তথ্যপ্রমাণ নষ্টের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে, আগুন লাগার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে তথ্যপ্রমাণ ও নগদ টাকা সঠিকভাবে সুরক্ষিত বা সিল করার ক্ষেত্রে গুরুতর গাফিলতি করা হয়েছিল। প্রথম দফার উদ্ধারকর্মীরা চলে যাওয়ার পর ঘরটি তাৎক্ষণিকভাবে সিল না করে সাফাইয়ের কাজ করা হয়, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ মেটেরিয়াল এভিডেন্স হাতবদল বা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় বিচারপতির ব্যক্তিগত সচিব এবং গৃহকর্মীদের উপস্থিতির কথাও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
৩. বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ
যদিও তদন্ত কমিটি এই সিদ্ধান্তকে সরাসরি ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত করার রায় হিসেবে দেখেনি, তবে দেশের বিচার ব্যবস্থার শীর্ষস্তরে এ ধরনের আর্থিক অস্বচ্ছতা এবং চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়াকে অত্যন্ত নজিরবিহীন ও গুরুতর প্রশাসনিক অবক্ষয় হিসেবে দেখছেন ওয়াকিবহাল মহল।