ত্রাণের পাহাড়ে লুকিয়ে দুর্নীতি! বারুইপুরের গোডাউনে মিলল সরকারি ত্রিপল-খাবার, সরগরম রাজনীতি

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের ফুলতলায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহের তালিকায় থাকা একটি ব্যক্তিগত গোডাউনে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণ সামগ্রী। উদ্ধার হওয়া উপকরণের মধ্যে রয়েছে ত্রিপল, জামাকাপড়, শীতবস্ত্র এবং শুকনো খাবারের বিশাল সম্ভার। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ স্থানীয় শাসকদল।
স্থানীয় সূত্রে খবর, ফুলতলার ওই গোডাউনটি নিয়ে এলাকাবাসীর মনে দীর্ঘদিনের সন্দেহ ছিল। রাতে অন্ধকারে ছোট-বড় গাড়িতে করে মালামাল আনা-নেওয়ার দৃশ্য বাসিন্দাদের নজর এড়ায়নি। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। বুধবার স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা এই বিষয়ে সরব হন এবং প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর পরেই পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী তড়িঘড়ি অভিযানে নামে। উদ্ধার হওয়া সামগ্রী সরাতে প্রায় পাঁচটি বড় গাড়ির প্রয়োজন হয়, যা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় মজুত করা সামগ্রীর পরিমাণ কতটা বিশাল ছিল।
উদ্ধার হওয়া সমস্ত ত্রাণ সামগ্রী বারুইপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সামগ্রীগুলোর উৎস এবং মালিকানা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুমান, এই সামগ্রীগুলি হয়তো কোনও সরকারি প্রকল্প বা দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য বরাদ্দ ছিল। যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে এগুলি সাধারণ মানুষের জন্য আসা ত্রাণ ছিল, তবে এটি এক বিশাল দুর্নীতির মামলা হিসেবে গণ্য হবে বলে ধারণা করছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। বিজেপির অভিযোগ, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে বারুইপুর পূর্ব বিধানসভার বিধায়ক বিভাস সরদার এবং পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি শ্যামসুন্দর চক্রবর্তীর মদতে এই ত্রাণ সামগ্রী লুট করা হয়েছে। দুর্গত মানুষের জন্য বরাদ্দ ত্রাণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ বিরোধী শিবিরের। বিজেপি নেতা বিশ্বম্ভর বাবাজীর দাবি, এটি কেবল হিমশৈলের চূড়া মাত্র। এলাকায় আরও অনেক গোডাউন রয়েছে যেখানে ত্রাণ সামগ্রী লুকিয়ে রাখা হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি এই ঘটনার নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, এই ঘটনার পর অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্বও আপাতত এ বিষয়ে চুপ। তবে এই ত্রাণ-কাণ্ডে এলাকার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় যখন মানুষ ত্রাণের অপেক্ষায় থাকে, তখন সেই সামগ্রী এভাবে গোপনে মজুত করে রাখা কেবল আইনি অপরাধ নয়, বরং চরম অমানবিক বলে মন্তব্য করছেন সচেতন নাগরিকরা। ঘটনাস্থলে বিপুল ভিড় সামলাতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তদন্ত যত এগোবে, তত নতুন নতুন তথ্য সামনে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই দুর্নীতির জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা উন্মোচন করতে পারে কি না।