ডায়াবেটিস হয়েছে বলে কি ভাত-আলু বা প্রিয় আম খাওয়া বন্ধ? এই ভুলগুলো করলেই বিপদ!

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই আতঙ্কে ভাত, আলু, আম কিংবা কলার মতো চিরচেনা খাবারগুলো খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। পরিবার, পরিচিতজন কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচলিত নানা ভ্রান্ত ধারণার জেরে অনেকেরই মনে হয় এই খাবারগুলোই বুঝি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার একমাত্র কারণ। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। আমেরিকার ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে পার্টনারশিপে সান ফার্মার সচেতনতামূলক উদ্যোগ ‘Gyaan by Ganesh’-এর তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে কোনো একটি নির্দিষ্ট খাবার এককভাবে দায়ী নয়। আসল চাবিকাঠি হলো খাবারের পরিমাণ, রান্নার পদ্ধতি এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভারসাম্য।

সাধারণ মানুষের মনে থাকা বেশ কিছু ভ্রান্ত ধারণার বিজ্ঞানভিত্তিক সত্যতা তুলে ধরা হয়েছে এই সচেতনতামূলক উদ্যোগে। অনেকেরই ধারণা ডায়াবেটিসে আম একেবারেই খাওয়া যাবে না, অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিমিত পরিমাণে (অর্ধেক কাপ বা ৮০-১০০ গ্রাম) আম খাওয়া যেতে পারে, কারণ এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন এ, ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। একইভাবে, আলু খাওয়া নিয়েও রয়েছে অনেক ভীতি। বিশেষজ্ঞরা জানান, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা চিপসের মতো ভাজা আলু এড়িয়ে চলা উচিত হলেও সেদ্ধ বা বেক করা আলু পরিমিত পরিমাণে এবং প্রোটিনের সঙ্গে খাওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ।

কলা নিয়ে প্রচলিত ধারণাও ঠিক নয়। ছোট বা মাঝারি আকারের একটি কলার পুষ্টিগুণ যেমন ফাইবার, পটাশিয়াম ও ভিটামিন বি-৬ শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী, যা সঠিক ডায়েটের অংশ হতে পারে। অন্যদিকে, অনেকেই সাদা চিনির বিকল্প হিসেবে গুড়, মধু বা ব্রাউন সুগারকে নিরাপদ মনে করলেও চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, এগুলিতেও কার্বোহাইড্রেট থাকে এবং রক্তে শর্করা বাড়াতে সমানভাবে সক্ষম। এমনকি বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত সম্পর্কেও রয়েছে বড় ভুল ধারণা। ডায়াবেটিস মানেই ভাত সম্পূর্ণ বর্জন নয়; ভাতের সঙ্গে ডাল, শাকসবজি বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার মিশিয়ে সুষম আহার তৈরি করলে তা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

কলকাতার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. জয়দীপ দত্ত (এমডি মেডিসিন, ডিএম এন্ডোক্রিনোলজি) বলেন, “ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর অনেকেই মনে করেন তাঁদের পছন্দের সব খাবার বাদ দিতে হবে। কিন্তু বাস্তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়।” তিনি আরও জানান, সঠিক পরিমাণ, সঠিক সময়ে খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই দীর্ঘমেয়াদে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য কিছু সহজ জীবনযাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেমন— প্লেটের অর্ধেক অংশ নন-স্টার্চি সবজি দিয়ে ভরাট করা, প্রতিটি খাবারের সঙ্গে প্রোটিন রাখা, খাবার পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা, মিষ্টি পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত শরীরচর্চা করা। ডায়াবেটিস মানেই প্রিয় সব খাবার বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সঠিক জীবনযাপন ও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়।