শৈশবে আমরা কী খাচ্ছি, তা কেবল শারীরিক গঠনের ওপর প্রভাব ফেলে না, বরং আমাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতাকেও চিরস্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে। ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্ক (UCC)-এর গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ছোটবেলায় অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা পরবর্তী জীবনে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে ফিরে এলেও পুরোপুরি মোছা সম্ভব হয় না।
মস্তিষ্কের ওপর যেভাবে প্রভাব ফেলে জাঙ্ক ফুড: গবেষণায় উঠে এসেছে যে, উচ্চ ফ্যাট এবং উচ্চ চিনিযুক্ত খাবার শিশুদের মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে প্রভাবিত করে, যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য গ্রহণের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রক্রিয়াটিকে বলা হচ্ছে ‘ব্রেইন রি-ওয়্যারিং’।
হাইপোথ্যালামাসের ভূমিকা: জাঙ্ক ফুড মস্তিষ্কের ‘হাইপোথ্যালামাস’ নামক অঞ্চলকে ব্যাহত করে, যা শরীরের শক্তি ও ক্ষুধার ভারসাম্য রক্ষা করে। একবার এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তা সারাজীবনের জন্য খাদ্যাভ্যাসে অস্বাভাবিকতা তৈরি করতে পারে।
স্থায়ী প্রভাব: গবেষকদের মতে, শৈশবে এই অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস কেবল ওজন বাড়িয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং এটি মস্তিষ্কের সেই পথগুলোকে স্থায়ীভাবে পরিবর্তন করে দেয়, যা বড় হওয়ার পরেও ব্যক্তির খাদ্য পছন্দের ওপর প্রভাব ফেলে।
মানসিক ও আচরণগত সমস্যা: শুধু ক্ষুধা নয়, প্রাক-বয়ঃসন্ধিকালে প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার ফলে মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’ অর্থাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণকারী অংশটিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পরবর্তীতে импульসিভ বা আবেগপ্রবণ আচরণের ঝুঁকি বাড়ায়।
সুখবর: কীভাবে প্রতিকার সম্ভব? তবে নিরাশ হওয়ার কিছু নেই। গবেষণায় এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার কিছু আশার আলোও দেখা গেছে:
উপকারী ব্যাকটেরিয়া (Probiotics): অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম বা স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য রক্ষা করা হলে মস্তিষ্কের ওপর এই ক্ষতিকর প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব। ‘বিফিডোব্যাকটেরিয়াম লংগাম’ (Bifidobacterium longum)-এর মতো প্রোবায়োটিক উপাদান অন্ত্রের স্বাস্থ্যের মাধ্যমে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে সাহায্য করতে পারে।
ফাইবারযুক্ত খাবার: পেঁয়াজ, রসুন, কলা বা ফাইবারযুক্ত খাবার (Prebiotic fibres) নিয়মিত ডায়েটে রাখলে তা অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: আজকের শিশুরা স্কুল, পার্টি বা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সহজেই প্রক্রিয়াজাত খাবারের নাগাল পাচ্ছে। গবেষকদের মতে, বাবা-মায়েদের উচিত ছোটবেলা থেকেই শিশুদের ‘খাদ্য-নির্বাচনে’ সচেতন করা। কারণ, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও, শৈশবের এই ‘হিডেন’ বা লুকানো মস্তিষ্কের পরিবর্তনগুলো বড় হওয়ার পরেও দীর্ঘমেয়াদী স্থূলতা ও বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।





