চিনকে টেক্কা দিতে ভারতে বসছে মেগা সামিট! মধ্য এশিয়াকে ঘিরে প্রধানমন্ত্রী মোদির কোন মাস্টারপ্ল্যানে কাঁপছে বিশ্ব?

ভারতের ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে এক নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। আগামী বছর ভারতে বসতে চলেছে বহু প্রতীক্ষিত মধ্য এশিয়া সম্মেলন। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর আবারও নিজভূমে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করার মাধ্যমে নয়াদিল্লি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইউরেশিয়া অঞ্চলে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে মজবুত করতে তারা কতটা মরিয়া। এর আগে ২০২২ সালে একবারমাত্র এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করেছিল ভারত। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ একদিকে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে, অন্যদিকে তখন মধ্য এশিয়ার বিশাল সম্পদভাণ্ডার নিজেদের অনুকূলে টানতে নয়া রণকৌশল সাজাচ্ছে মোদি সরকার।
তবে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে দিল্লির এই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতার পথে সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভৌগোলিক দূরত্ব এবং যোগাযোগের বেহাল দশা। কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তানের মতো খনিজ ও হাইড্রোকার্বনে সমৃদ্ধ দেশগুলিতে সরাসরি পৌঁছানোর জন্য ভারতের কাছে কোনো ভৌগোলিক সীমান্ত বা স্থলপথ নেই। পাকিস্তানের ভূখণ্ড ব্যবহার করা ছাড়া সেখানে পৌঁছানোর সহজ কোনো রুট নেই, যা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ অসম্ভব। তা সত্ত্বেও বিকল্প পথ হিসেবে ইরানের কৌশলগত চাবাহার বন্দর নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহণ করিডর (INSTC) চালুর উদ্যোগের ওপর ভরসা রাখছে ভারত। যদিও ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই প্রকল্পগুলির কাজে সাময়িক গতি শ্লথ হয়েছে, তবুও বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রির মতে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দিল্লি, যাতে যুদ্ধ থামলেই এই যোগাযোগের পথগুলিকে দ্রুত সচল করা যায়।
এই সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিগত দেড় দশকে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর এই অঞ্চলের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত ১৫ বছরের তুলনার সাড়ে তিন গুণ বেশি। ভারত এই দেশগুলিতে প্রধানত পরিশোধিত তেল, সার ও তামা রপ্তানি করলেও সেখান থেকে জীবনদায়ী ওষুধ ও কৃষিজাত পণ্য আমদানি করে। সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব অনুধাবন করে উজবেকিস্তান ভারতীয় নাগরিকদের জন্য এক মাসের ভিসা-মুক্ত যাত্রার ঐতিহাসিক ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, পরমাণু ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরেনিয়াম আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রাধান্য পাচ্ছে।
তবে এই সমস্ত বাণিজ্যিক অগ্রগতির মাঝেও মধ্য এশিয়া অঞ্চলে বেজিংয়ের বিশাল ছায়া ও আধিপত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই ভূখণ্ডে চিনের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এবং তাদের সুপরিচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের একটি বিশাল কেন্দ্রবিন্দু হলো এই মধ্য এশিয়া অঞ্চল। মধ্য এশিয়ায় চিনের প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বর্তমানে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা রাশিয়াকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে মধ্য এশিয়ায় ভারতের মোট বিনিয়োগ এখনও দেড় বিলিয়ন ডলারের আশেপাশে। ফলে সরাসরি প্রতিযোগিতায় চিনকে রাতারাতি টেক্কা দেওয়া ভারতের পক্ষে কঠিন হলেও, বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান একাধিপত্যকে প্রতিহত করতে এবং ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে মধ্য এশিয়ার দেশগুলির কাছে ভারতই একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী বিকল্প।
তিলোত্তমা ফাউন্ডেশনের ইউরেশিয়া বিশেষজ্ঞ ড. মিনা সিং রায়ের মতে, মধ্য এশিয়ার দেশগুলিও চায় ভারত এই অঞ্চলে আরও জোরালো এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করুক। ডিজিটাল পরিকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, পর্যটন, খাদ্য নিরাপত্তা ও শিক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলিতে সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়ানোর বিশাল সুযোগ রয়েছে। দিল্লির সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক সদিচ্ছা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপই আগামী দিনে মধ্য এশিয়ার বাজারে ভারতের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শিকড়কে কতদূর মজবুত করতে পারবে, সেটাই এখন দেখার সবচেয়ে বড় কৌতূহল।