চালান না কাটালেই রেহাই নেই! ট্রাফিক নিয়ম ভাঙলে এবার সরাসরি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যুক্ত হবে জরিমানা!

সড়ক পরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং নিয়মভঙ্গকারীদের ওপর কঠোর মানসিক চাপ তৈরি করতে এক যুগান্তকারী ও নজিরবিহীন প্রস্তাব দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘন করে কেবল ই-চালান কেটে খালাস পাওয়া চালকদের জন্য এবার বড় বিপদের ঘণ্টা বাজিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। আদালত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, হাজার হাজার বা লক্ষ লক্ষ ই-চালান তৈরি করা বা ইস্যু করাটাই আসল সমাধান নয়, আসল চ্যালেঞ্জ হলো সেই জরিপের বকেয়া টাকা সম্পূর্ণভাবে আদায় করা। এই পরিস্থিতিতে ঝুলে থাকা বিশাল অংকের বকেয়া ই-চালান আদায়ের জন্য এমন একটি কঠোর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা আইন অমান্যকারীদের যেভাবেই হোক জরিমানা পরিশোধ করতে বাধ্য করবে।

লবণের ওপর খাড়ার মতো একটি অত্যন্ত কঠোর ও অভাবনীয় প্রস্তাব দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে, বকেয়া ট্রাফিক চালানের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরাসরি বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। ঠিক যেমন বিদ্যুৎ বিলের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট সংযোগ কেটে দেওয়া হয়, তেমনই ট্রাফিক চালানের টাকা না দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার রূপরেখা খোঁজার পরামর্শ দিয়েছে আদালত। বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলিতে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ই-চালান জারি করা হয়েছে। যার মধ্যে মাত্র ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায় করা সম্ভব হয়েছে এবং প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ই-চালান এখনও সম্পূর্ণ বকেয়া পড়ে রয়েছে।

এই বিশেষ শুনানিতে বিচারপতি জে. বি. পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে. ভি. বিশ্বনাথনের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ বকেয়া চালানের জট কাটাতে বেশ কয়েকটি কঠোর বিকল্প ব্যবস্থার কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছে। এর মধ্যে রয়েছে बकाया চালানের তালিকাভুক্ত গাড়িগুলিকে কালো তালিকাভুক্ত করা, গাড়ির মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া এবং রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (RC) বা ফিটনেস সার্টিফিকেট নবীকরণের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা জারি করা। এমনকি দূষণ নিয়ন্ত্রণ শংসাপত্র (PUC) এবং চালকের লাইসেন্স নবীকরণের ক্ষেত্রেও বড়সড় আইনি বাধা তৈরি করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

এদিকে, দেশের রাজধানী দিল্লির বর্তমান পরিস্থিতি এই সংকটের গভীরতাকে আরও বেশি করে ফুটিয়ে তুলছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত দিল্লিতে ট্রাফিক চালান এবং স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার মাধ্যমে পাঠানো নোটিশের মোট পেন্ডিং বা বকেয়া হার প্রায় ৭৩ শতাংশ। স্পট বা সরাসরি কাটা প্রায় ১.৭ কোটি চালানের মধ্যে প্রায় ১.১ কোটি চালানের কোনো পেমেন্ট করা হয়নি। অন্যদিকে, ক্যামেরা ভিত্তিক নোটিশের প্রায় ৪.৫ কোটি মামলার মধ্যে প্রায় ৩.৪ কোটিই বকেয়া পড়ে রয়েছে। বকেয়া চালানের এই লম্বা তালিকার শীর্ষে রয়েছে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর মতো গুরুতর অপরাধ। এছাড়া ভুল পার্কিং, হেলমেট ছাড়াই বাইক চালানো এবং ট্রাফিক সিগন্যাল বা লালবাতি ভাঙার মতো অপরাধের সংখ্যাও লক্ষাধিক ছাড়িয়ে গেছে।

বকেয়া আদায়ের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জটিল পেমেন্ট প্রক্রিয়া এবং লোক আদালতের ওপর মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষা। অনেক সময় সাধারণ মানুষ নামমাত্র খরচে মামলা মেটানোর আশায় লোক আদালতের দিকে তাকিয়ে থাকেন, যা বিচার ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তবে এই পরিস্থিতি বদলাতে ইতিমধ্যেই নানা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ তাদের ই-चालान ব্যবস্থাকে ভারত বিল পেমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে সফলভাবে সংযুক্ত করেছে, যার ফলে ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থার মাধ্যমে খুব সহজেই বকেয়া জরিমানা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে। এছাড়া হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও নাগরিকদের নির্দিষ্ট নোটিশ পাঠানো হচ্ছে। সবমিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে রাস্তায় ট্রাফিক আইন ভেঙে চালান কাটার দিন শেষ, এখন প্রতিটি বকেয়া টাকার হিসাব মেটানোর সময় চলে এসেছে।