চাকরিপ্রার্থীদের জন্য বিরাট সুখবর! দেশের মধ্যে কর্মী নিয়োগে সমস্ত রেকর্ড ভেঙে শীর্ষস্থান দখল করল কোন শহর?

দেশের কর্পোরেট ও হোয়াইট-কলার চাকরির বাজারে এক অভূতপূর্ব ও স্বস্তিদায়ক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি (IT) এবং অ-তথ্যপ্রযুক্তি উভয় খাতেই দেশজুড়ে কর্মসংস্থানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিখ্যাত জব পোর্টাল ‘নকরি ডট কম’-এর সাম্প্রতিক ‘জবস্পিক ইনডেক্স’ (JobSpeak Index) রিপোর্ট অনুযায়ী, গত বছরের অগস্ট মাসের তুলনায় এ বছর সমগ্র দেশে কর্পোরেট নিয়োগে ১৪ শতাংশ জোরালো প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। ইনডেক্সের মান গত বছরের ২,৬৬৪ পয়েন্ট থেকে লাফিয়ে বেড়ে ৩,০২৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি স্পষ্ট ও ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে।
এই জাতীয় প্রবৃদ্ধির দৌড়ে সমস্ত প্রধান মহানগরী ও আইটি হাবগুলিকে পিছনে ফেলে একেবারে শীর্ষস্থান দখল করে নিয়েছে নিজামের শহর হায়দরাবাদ। হায়দরাবাদে কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধির হার এক ধাক্কায় ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে উৎসবের মরশুমের সময় পরিবর্তনের বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছর ফেসটিভ সিজন অগস্টে শুরু হলেও এ বছর তা সেপ্টেম্বর মাসে শুরু হয়েছে, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক নিয়োগ পরিসংখ্যানে। ইনফো এজ (ইন্ডিয়া) লিমিটেড-এর এমডি ও সিইও হিতেশ ওবেরয় অবশ্য মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, উৎসবের পুরো মরশুম ও ত্রৈমাসিক সময়সীমা সম্পূর্ণ সমাপ্ত হওয়ার পরেই বাজারের প্রকৃত ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতির চিত্রটি আরও বেশি স্পষ্ট হবে।
শহরভিত্তিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির এই মানচিত্রে হায়দরাবাদের পরেই দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করেছে কলকাতা (২২ শতাংশ) এবং চেন্নাই (২০ শতাংশ)। এর পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী আইটি শহর হিসেবে পরিচিত বেঙ্গালুরু ও পুণেতে ১৪ শতাংশ করে গ্রোথ অর্জিত হয়েছে। অন্যদিকে, দিল্লি-এনসিআর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বইতে কর্মী নিয়োগ বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ১০ ও ৭ শতাংশ। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রথম সারির শহরগুলির পাশাপাশি ছোট ও দ্বিতীয় সারির শহরগুলিতেও কর্মসংস্থানের জোয়ার বইছে। ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বর এক লাফে ৩২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এছাড়া ছত্তিশগড়ের রায়পুর (২৩ শতাংশ), গুজরাটের সুরাট (২১ শতাংশ) এবং ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতেও (১৯ শতাংশ) অত্যন্ত শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি পরিলক্ষিত হয়েছে।
বিভিন্ন শিল্পখাত বা সেক্টরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, ১৯ শতাংশ নিয়োগ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ‘অটোমোবাইল খাত’ তালিকার একেবারে শীর্ষে অবস্থান করছে। পাশাপাশি, স্বাস্থ্যসেবা ও খুচরা বিক্রয় (রিটেইল) খাত যথাক্রমে ১৬ ও ১৫ শতাংশ শক্তিশালি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বীমা খাতে নতুন চাকরির সুযোগ ১২ শতাংশ এবং সফটওয়্যার খাতে ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যাংকিং ও এফএমসিজি (FMCG) উভয় খাতেই ১০ শতাংশ করে এবং বিপিও/আইটিইএস, তেল-গ্যাস ও রিয়েল এস্টেট খাতে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। ফার্মা ও বায়োটেক খাত তাদের পূর্বের স্থিতিশীল অবস্থান বজায় রাখলেও, পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে ৪ শতাংশ এবং শিক্ষা খাতে ৮ শতাংশ নিয়োগ হ্রাস পেয়েছে।
অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের পাশাপাশি এ বার নতুন কর্মীদের (ফ্রেশার) জন্যও সুখবর নিয়ে এসেছে চাকরির বাজার। বিভিন্ন সংস্থায় ফ্রেশারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ জোরালো প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। তবে কোম্পানিগুলির মূল ফোকাস এখনও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের ওপরেই রয়েছে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগের পরিসংখ্যান বলছে, ৪ থেকে ৭ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্নদের জন্য ১০ শতাংশ, ৮ থেকে ১২ বছর অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে ১৬ শতাংশ, ১৩ থেকে ১৬ বছরের অভিজ্ঞদের জন্য ১৮ শতাংশ এবং ১৬ বছরের বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সিনিয়র পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতীয় চাকরির বাজার অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ম্যানপাওয়ারগ্রুপের সর্বশেষ ‘এমপ্লয়মেন্ট আউটলুক সার্ভে’ অনুযায়ী, চলতি বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের মধ্যে ভারত একেবারে প্রথম স্থান অধিকার করেছে। ভারতের ‘নেট এমপ্লয়মেন্ট আউটলুক’ বা নিট কর্মসংস্থান সূচক দাঁড়িয়েছে ৫৪ শতাংশে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৬ শতাংশ এবং গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। সারা দেশের ৩,০৫৫টি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ওপর চালানো এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রায় ৬৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আগামী তিন মাসের মধ্যে তাদের কর্মীসংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে, যা ভারতের ক্রমবর্ধমান কর্মসংস্থান বাজারের এক দুর্দান্ত ও উজ্জ্বল ছবি তুলে ধরে।