গাড়ির ছাদে উঠলেন রাহুল-অখিলেশ! সুপ্রিম কোর্টের জনস্বার্থ মামলায় তোলপাড় রাজনীতি

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ব্যাপক কারচুপি ও অনিয়মের অভিযোগে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলো বিরোধী ‘INDIA’ জোট। সোমবার লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL) দাখিল করা হয়। একই সঙ্গে দিল্লিতে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রশাসনের একের পর এক বাধা ও বিধিনিষেধের বিরুদ্ধেও সর্বোচ্চ আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন বিরোধী নেতারা।

পিটিশন জমা দেওয়ার আগে রাজধানীতে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বা গণতন্ত্র বাঁচাও মিছিলে নামেন INDIA ব্লকের শীর্ষ নেতারা।

ভগবান দাস রোডে পুলিশি বাধা, গাড়ির ছাদে রাহুল-অখিলেশ

সোমবার সকালে কনস্টিটিউশন ক্লাবে একত্রিত হয়ে চারটি বাসে চেপে বারাখাম্বা রোডে পৌঁছান বিরোধী সাংসদ ও কর্মী-সমর্থকরা। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগোতে গেলে ভগবান দাস রোডের কাছে বিশাল ব্যারিকেড দিয়ে মিছিল আটকে দেয় দিল্লি পুলিশ।

পুলিশি বাধায় মিছিল আটকে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময়ই প্রতিবাদ জানাতে একটি গাড়ির ছাদে চেপে বসেন রাহুল গান্ধী, অখিলেশ যাদবসহ একাধিক শীর্ষ নেতা। পরবর্তীতে নেতাদের আইনি দল শীর্ষ আদালতে চূড়ান্ত আবেদনপত্রটি জমা দেয়। যদিও পিটিশনে ঠিক কী কী সুনির্দিষ্ট নির্দেশ চাওয়া হয়েছে, তা এখনও জনসমক্ষে আনা হয়নি।

১১ জন হেভিওয়েট নেতা ও ৪ বিবাদী

সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা এই হাই-প্রোফাইল জনস্বার্থ মামলায় মোট ১১ জন প্রথম সারির বিরোধী নেতা আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন:

  • রাহুল গান্ধী ও মল্লিকার্জুন খাড়গে (কংগ্রেস)

  • অখিলেশ যাদব (সমাজবাদী পার্টি)

  • সৌগত রায় (তৃণমূল কংগ্রেস)

  • তেজস্বী প্রসাদ যাদব (আরজেডি)

  • সঞ্জয় রাউত (শিবসেনা – ইউবিটি)

  • সুপ্রিয়া সুলে (এনসিপি – এসসিপি)

  • এম এ বেবি (সিপিআইএম) ও ডি রাজা (সিপিআই)

  • মহুয়া মাঝি (জেএমএম) ও ইটি মহম্মদ বশির (আইইউএমএল)

মামলাটিতে নির্বাচন কমিশনসহ (ECI) মোট চারটি পক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে। তবে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটির শুনানি কবে হবে, সে বিষয়ে এখনও দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়নি।

সিজেআই-এর সঙ্গে সাক্ষাতের আর্জি খারিজ

এর আগে লোকসভা ও রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতারা প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির (Separation of Powers) কথা মনে করিয়ে দিয়ে সেই আর্জি খারিজ করে দেন প্রধান বিচারপতি। তিনি জানান, সর্বোচ্চ আদালতে বিচার্য বা বিচারাধীন বিষয় নিয়ে সিজেআই-এর সঙ্গে এমন সাক্ষাৎ আইনি নীতিবিরোধী হতে পারে।

প্রবীণ আইনজীবী ও কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিংভি জানান, “প্রধান বিচারপতির কাছে সাক্ষাতের আর্জি জানানো হয়েছিল আইনি আলোচনার জন্য। তবে আইনি পথ অনুসরণের পরামর্শ পাওয়ার পর আমরা সরাসরি আদালতের দরজায় আবেদন জানিয়েছি। এখানে বিচারব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরির কোনো প্রশ্নই নেই।”

“পদত্যাগ করুন, রাজসাক্ষী হন”: রাহুল গান্ধীর বিস্ফোরক বার্তা

প্রধান বিচারপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব না হতেই কংগ্রেস সদর দফতরে দাঁড়িয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করে তীব্র আক্রমণ শাণান রাহুল গান্ধী।

সাংবাদিক বৈঠকে রাহুল সরাসরি জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনি পদত্যাগ করুন এবং রাজসাক্ষী হন। ভোটার তালিকায় যে গোলমাল করা হয়েছে, তার মূল চক্রান্তকারী আপনি নন। আপনার ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে। তাই সত্যিটা সামনে আনুন।”

রাহুল আরও দাবি করেন, অন্তত ২০০ জন সরকারি আধিকারিক বর্তমানে বিরোধী শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং অনিয়মের বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করছেন। প্রয়োজনে এই আন্দোলন দীর্ঘদিন চালানো হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

‘ডেমোকুর্সি’ ও বিক্ষোভের স্থান বিতর্ক

এদিকে গত ১১ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ এক নির্দেশিকা জারি করে রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি গ্রাউন্ড ও পূর্ব দিল্লির CBD গ্রাউন্ডকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করে যন্তর মন্তরকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ একে ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ বলে তোপ দাগেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যঙ্গ করে তিনি ‘ডেমোক্রেসি’র বদলে ‘ডেমোকুর্সি’ বলেও কটাক্ষ করেন।