“খরার কোপে ইথানল মিশন!”-পেট্রোলে ২০% মিশ্রণের উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে বড় ধাক্কা কেন্দ্রর

জ্বালানি খাতে বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং কোটি কোটি ডলার সাশ্রয় করতে ইথানল ব্লেন্ডিং বা পেট্রোলে ইথানল মেশানোর ওপর বড় ভরসা রেখেছিল কেন্দ্র সরকার। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর সেই উচ্চাভিলাষী কর্মসূচিতে এবার বড়সড় ধাক্কা দিল আবহাওয়া। চলতি বছর বর্ষার মরশুমে দেশে যে পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে, তা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এল নিনোর প্রভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ কম বৃষ্টি হওয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভুট্টা ও আখের ফলন। ফলে এই দুই ফসলের দাম হু-হু করে বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে দেশের জ্বালানি নীতির ওপর।

আকাশছোঁয়া খাদ্যের দাম: ৪০% বাড়ল চিনি ও ভুট্টা!

বৃষ্টির ঘাটতির কারণে বাজারে খাদ্যশস্যের জোগানে টান পড়েছে। সরকারি ও বাজার সূচক অনুযায়ী:

  • ভুট্টা ও চিনি: দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

  • চাল: দাম বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ।

  • খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি: সেপ্টেম্বর মাসে খুচরো খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি লাফিয়ে ৭.৭৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের মাসেই ছিল ৫.৯৭ শতাংশ।

দেশের বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়াদিল্লি চিনি ও ভুট্টার বাণিজ্যিক ব্যবহারের ওপর বেশ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। এর ফলে পেট্রোলে ইথানল মেশানোর বর্তমান ২০ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশে নামিয়ে আনতে হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

E20 প্রকল্প ও ২১.১ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ের রেকর্ড

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জ্বালানি সুরক্ষা পরিকল্পনার একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ‘E20’ কর্মসূচি। এই প্রকল্পের অধীনে পেট্রোলের সঙ্গে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো হয়।

সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই পদক্ষেপের ফলে ভারত এ যাবৎ তেল আমদানি বাবদ প্রায় ২ ট্রিলিয়ন রুপি (২১.১ বিলিয়ন ডলার) সাশ্রয় করতে পেরেছে। লক্ষ্য ছিল পেট্রোলে ২০% ইথানল মিশিয়ে বছরে প্রায় ৪৩০ বিলিয়ন টাকা বাঁচানো, যা নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ বছর আগেই অর্জন করে ফেলেছিল ভারত। কিন্তু কাঁচামালের এহেন চরম সংকট গোটা পরিস্থিতিকে আচমকা জটিল করে তুলেছে।

খাদ্য না জ্বালানি? সব নজর ভুট্টার দামের ওপর

পেট্রোলে ইথানল মেশানোর হার কতটা কমবে, তা এখন পুরোটাই নির্ভর করছে ভুট্টার বাজারদরের ওপর। কেএন এগ্রি রিসোর্সেস-এর চেয়ারম্যান তথা ফুড পলিসি বিশেষজ্ঞ জিকে সুদের মতে, “ভারত বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ। তাই খরার মতো পরিস্থিতিতে জ্বালানির চেয়ে সাধারণ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তাকেই আগে অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

বড় বিপদে ডিস্টিলারি ও ইথানল উৎপাদকেরা

ইথানল উৎপাদন বাড়াতে দেশের একাধিক চিনি কল ও ডিস্টিলারি সংস্থা বড় অংকের ব্যাংক ঋণ নিয়ে নিজেদের উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন লিটার পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। এখন যদি সরকার পেট্রোলে ইথানল মেশানোর হার কমিয়ে ১৫-১৭ শতাংশে নামিয়ে আনে, তবে এই অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাবে এবং বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বেন উৎপাদকেরা।

যদিও কেন্দ্র সরকারের তরফে এখনও চূড়ান্ত কোনও নির্দেশিকা জারি করা হয়নি, তবুও চাল-ভুট্টা-চিনির ঊর্ধ্বমুখী দামের বাজারে জ্বালানি নীতি বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।