কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে কি তৈরি হতে পারে চেতনা? ‘ক্লড’ নির্মাতাদের গোপন বৈঠকের কথা ফাঁস করলেন স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) জগতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এবং জনপ্রিয় ‘ক্লড’ (Claude) মডেল সিরিজের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক প্রযুক্তি ও নৈতিকতার মেলবন্ধনে এক অভিনব পদক্ষেপ করেছে। এআই-এর নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং ভবিষ্যতের রূপরেখা নিয়ে বিশদ আলোচনার জন্য রামকৃষ্ণ মিশনের বিশিষ্ট হিন্দু সন্ন্যাসী স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দকে সান ফ্রান্সিসকোর নিজেদের প্রধান কার্যালয়ে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এই প্রযুক্তি জায়ান্ট। ২০২৬ সালের জুনে ডালাসে আয়োজিত এক বক্তৃতায় স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ এই সফরের পেছনের অজানা কাহিনি সকলের সামনে তুলে ধরেন। তাঁর এই বক্তব্যের ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় হু হু করে ভাইরাল হতেই ধর্মীয় পণ্ডিত, দার্শনিক এবং প্রযুক্তি মহলে শুরু হয়েছে তীব্র জল্পনা।

সূত্রের খবর অনুযায়ী, অ্যানথ্রোপিক প্রথমে অনলাইনে একটি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারের জন্য রামকৃষ্ণ মিশনের এই প্রখ্যাত সন্ন্যাসীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। পরবর্তীতে সেই আলোচনা আরও গভীর হওয়ায় তাঁকে সশরীরে সান ফ্রান্সিসকোতে সংস্থার সদর দপ্তর পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই বিশেষ সফরে তিনি কেবল প্রযুক্তিবিদদের সঙ্গেই নন, বরং বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের চিন্তাবিদ, পরামর্শদাতা এবং একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন। আলোচনা মূলত এআই-এর নৈতিক ভিত্তি স্থাপন এবং ‘ক্লড’-এর প্রশিক্ষণের পদ্ধতিগুলোকে উন্নত করার বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল।

প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, অ্যানথ্রোপিক একা হিন্দু ধর্ম বা বেদান্ত দর্শন নয়, বরং ক্যাথলিক ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, শিখ ধর্ম এবং ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টধর্ম-সহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় ও দার্শনিক ঐতিহ্যের চিন্তাবিদদের সঙ্গে অত্যন্ত গোপনে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলিতে কেবল সাধারণ নৈতিকতার সীমারেখাই টানা হচ্ছে না, বরং ক্রমবর্ধমান উন্নত এআই সিস্টেমগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে কখনও চেতনা বা কোনো ধরনের নৈতিক মর্যাদা গড়ে উঠতে পারে কি না, তা নিয়েও গভীর পর্যালোচনা চলছে। উন্নত প্রযুক্তির আচরণ গঠনে আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি যে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করতে পারে, এই উদ্যোগ তারই প্রমাণ।

স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দ জানিয়েছেন যে, অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে এই পুরো বৈঠকটি একটি কঠোর ‘নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট’ বা গোপনীয়তা রক্ষা চুক্তির অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই কারণে তিনি আলোচনার সুনির্দিষ্ট ও ভেতরের অনেক তথ্য প্রকাশ্যে আনতে পারেননি। তবে তিনি উল্লেখ করেন যে, এই আয়োজনে ধর্মতাত্ত্বিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা প্রত্যেকেই ‘ক্লড’-এর ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের জন্য মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা, এই পুরো অধিবেশনজুড়ে অ্যানথ্রোপিকের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন নিজে উপস্থিত থেকে পুরো প্রক্রিয়াটিকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, যা এই সংস্থার সিরিয়াস মানসিকতারই পরিচয় দেয়।

আধুনিক ডিজিটাল যুগে অদ্বৈত বেদান্তের শাশ্বত শিক্ষাগুলোকে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা, স্বচ্ছতা এবং সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতার সঙ্গে বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বহু মানুষই স্বামী সর্বপ্রিয়ানন্দকে “ইন্টারনেট যুগের বিবেকানন্দ” হিসেবে শ্রদ্ধা করেন। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং প্রাঞ্জল বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মনে গভীর রেখাপাত করেছেন। এআই-এর মতো প্রযুক্তিগত অগ্রগতির যুগেও যে আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা কতটা জরুরি, অ্যানথ্রোপিকের এই উদ্যোগ তা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।