এক লাফে অনেকটাই বাড়তে পারে রেলকর্মীদের বেতন! অষ্টম বেতন কমিশনে কোন বড় প্রস্তাব দিল ইউনিয়ন?

অষ্টম বেতন কমিশনের (8th Pay Commission) কাছে রেলকর্মীদের বেতন কাঠামো সংস্কার এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা বৃদ্ধির জোরালো দাবি জানাল দেশের অন্যতম প্রধান রেল শ্রমিক সংগঠন ‘অল ইন্ডিয়া রেলওয়েমেনস ফেডারেশন’ (AIRF)। সম্প্রতি কমিশনের মুম্বই সফরের সময় প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে একটি বিশদ স্মারকপত্র জমা দেওয়া হয়, যেখানে রেল কর্মীদের কাজের বিশেষ প্রকৃতি এবং নানা ঝুঁকির কথা তুলে ধরে বেতন বৃদ্ধির জোরালো সওয়াল করা হয়েছে। সংগঠনের দাবি, ভারতীয় রেলের কাজের পরিধি এবং ঝুঁকি কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ সারা বছর ২৪ ঘণ্টা প্রতিকূল আবহাওয়া ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির মধ্যেও রেল পরিষেবা সচল রাখতে হয় কর্মীদের।

কমিশনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মূলত কয়েকটি ধাপে বিভিন্ন ক্যাটাগরির কর্মীদের সমস্যা ও দাবিগুলি তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রেলের ন্যূনতম বেতন এবং নির্দিষ্ট ভাতার বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে যথাক্রমে লোকো ও ট্রাফিক রানিং স্টাফ, ট্র্যাক মেনটেনার এবং সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পি-ওয়ে (P. Way) কর্মীদের কাজের জটিলতা ও পরিবেশ তুলে ধরা হয়। সবশেষে রেলের বিভিন্ন বিভাগের টেকনিশিয়ানদের বেতন কাঠামোর ফারাক, পদোন্নতির সুযোগ এবং কাজের ঝুঁকি সংক্রান্ত বিষয়গুলি কমিশনের সামনে পেশ করা হয়। চিঠিতে AIRF দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেছে যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি কিংবা যে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখতে রেল যেভাবে কাজ করে, তার প্রেক্ষিতে সেনার ঠিক পরেই ভারতীয় রেলকে ‘সেকেন্ড লাইন অফ ডিফেন্স’ বা দেশের প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় সারি হিসেবে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি।

রেলকর্মীদের জন্য AIRF-এর প্রধান দাবিগুলি নিচে আলোচনা করা হলো:
১. উচ্চতর বেতন কাঠামো: ভারতীয় রেলের দ্রুত আধুনিকীকরণ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার অগ্রগতির ফলে কর্মীদের কাজের দায়িত্ব ও দক্ষতার মান অনেক বেড়েছে। তাই রোলিং স্টক এবং রক্ষণাবেক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে যুক্ত কর্মীদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গণ্য করে উচ্চতর পে স্কেলে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
২. বিশেষ ঝুঁকি ও কঠিন পরিস্থিতির ভাতা: ডিউটি চলাকালীন রেলকর্মীদের জীবনহানি ও গুরুতর জখম হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এই বিষয়টি মাথায় রেখে Risk and Hardship Allowance, Hazardous Duty Allowance, Hill Allowance এবং Dress Allowance বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে।
৩. ট্র্যাক মেনটেনারদের মর্যাদা বৃদ্ধি: ট্র্যাক মেনটেনারদের বেতন ও পরিষেবার শর্তগুলো যাতে রেলের অন্যান্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের টেকনিশিয়ানদের সমতুল্য করা হয়, সেই দাবি তুলেছে ইউনিয়ন। বর্তমান উন্নত প্রযুক্তির যুগে ট্র্যাক মেনটেনারদেরও আধুনিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে কাজ করতে হয়।
৪. সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের কর্মীদের ভাতা: ট্র্যাক মেনটেনারদের পাশাপাশি পেট্রোলম্যান, কি-ম্যান এবং গেটম্যানদের জন্যও বিশেষ ভাতার সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হয়েছে, যাতে তাঁদের দৈনন্দিন কাজের ঝুঁকি ও দায়িত্বের সঠিক মূল্যায়ন হয়।
৫. টেকনিশিয়ানদের বেতন ও পদোন্নতি: সমস্ত ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের টেকনিশিয়ানদের জন্য একটি ন্যায্য ও উন্নত বেতন কাঠামো গড়ে তোলার দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি মধ্যবর্তী পে স্কেল একত্রিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা কর্মীদের কেরিয়ারে পদোন্নতির পথ অনেকটাই প্রশস্ত করবে।
৬. টেকনিশিয়ানদের জন্য ঝুঁকি ও পোশাক ভাতা: কাজের কঠিন পরিবেশের কথা মাথায় রেখে সমস্ত টেকনিশিয়ানদের পর্যাপ্ত পরিমাণে পর্যাপ্ত রিস্ক ও হার্ডশিপ অ্যালাউন্স এবং ড্রেস অ্যালাউন্স দেওয়ার জোরালো দাবি পেশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, AIRF-এর পেশ করা এই সমস্ত দাবিগুলি বর্তমানে অষ্টম বেতন কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে। কমিশন দেশের বিভিন্ন কর্মচারী সংগঠন, পেনশনভোগী ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের মতামত ও প্রস্তাবগুলি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করার পরেই তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট তৈরি করবে। তাই রেলকর্মীদের বেতন কাঠামোয় বা বিশেষ ভাতার ক্ষেত্রে ঠিক কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে কমিশনের চূড়ান্ত সুপারিশ এবং পরবর্তী সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের ওপর। আপাতত এই সমস্ত প্রস্তাবগুলিকে কোনো নিশ্চিত বেতন বা ভাতা বৃদ্ধি হিসেবে ধরে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।