একা কুক বনাম ৪ পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান! ১৯৬৫ সালের ঐতিহাসিক ‘ডগফাইট’-এর কিংবদন্তি বীরের জীবনাবসান

১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আলফ্রেড টাইরন কুক আর নেই। গত শুক্রবার নয়াদিল্লিতে ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) এই প্রবীণ যোদ্ধা। বায়ুসেনার ১৪ স্কোয়াড্রনের প্ল্যাটিনাম জয়ন্তী উপলক্ষে বিশেষ আমন্ত্রণে অস্ট্রেলিয়া থেকে ভারতে এসেছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় সামরিক ইতিহাসের এক স্বর্ণালী অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

পশ্চিমবঙ্গের খড়গপুরের কাছে কলাইকুন্ডা বিমানঘাঁটির আকাশে তাঁর প্রদর্শিত অবিস্মরণীয় সাহসিকতার জন্য তাঁকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ যুদ্ধকালীন বীরত্বের সম্মান ‘বীর চক্র’-এ ভূষিত করা হয়েছিল।

১৯৬৫ সালের কলাইকুন্ডা ‘ডগফাইট’: ইতিহাস গড়া সেই অসম লড়াই

১৯৬৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সকালে পাকিস্তানি বিমানবাহিনী (PAF) আচমকাই কলাইকুন্ডা বিমানঘাঁটিতে তীব্র বিমান হামলা চালায়। আকস্মিক এই হামলায় শুরুতে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ না মেলায় মাটিতে থাকা বেশ কয়েকটি ভারতীয় বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রথম দফায় সাফল্য পেয়ে উৎসাহিত হয়ে পাকিস্তান দ্বিতীয় দফায় তাদের শক্তিশালী F-86 Sabre যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে বড়সড় ধ্বংসলীলার ছক কষেছিল।

কিন্তু সেই সময় আকাশে কমব্যাট এয়ার প্যাট্রোলে পাহারায় ছিলেন ভারতীয় বায়ুসেনার ‘Bulls’ বা ১৪ নম্বর স্কোয়াড্রনের দুই দুঃসাহসী পাইলট—ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আলফ্রেড টাইরন কুক এবং তাঁর উইংম্যান ফ্লাইং অফিসার সুবোধ চন্দ্র মামগেইন।

প্রতিপক্ষের ৪টি অত্যাধুনিক বিমানকে রুখে দিতে কম উচ্চতায় শুরু হয় আকাশযুদ্ধ বা ‘ডগফাইট’। লড়াইয়ের এক পর্যায়ে দুই ভারতীয় বিমানের ফর্মেশন আলাদা হয়ে গেলে ১ বনাম ৪-এর অসম যুদ্ধে সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন আলফ্রেড কুক। খড়গপুর আইআইটির (IIT Kharagpur) ছাত্ররা সেদিন প্রতিষ্ঠানের ছাদ থেকে চাক্ষুষ করেছিলেন বায়ুসেনার ইতিহাসের অন্যতম এই রোমাঞ্চকর আকাশযুদ্ধ।

গোলাবারুদ ফুরিয়েও তাড়া করেছিলেন শত্রুবিমানকে

অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতেও কুক একাই আক্রমণ চালান ৪টি পাকিস্তানি বিমানে। তাঁর বিমানের গান-ক্যামেরার ফুটেজ অনুযায়ী, তিনি শত্রুপক্ষের ৪টির মধ্যে ৩টি বিমানকেই গুলি করে লক্ষ্যভেদ করেন।

  • প্রথম পাকিস্তানি Sabre বিমানটিকে সরাসরি গুলি করে আকাশেই চুরমার করে দেন তিনি, যার ফলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন পাক পাইলট।

  • পরবর্তী দুটি শত্রুবিমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেন।

  • একপর্যায়ে কুকের বিমানের সমস্ত গোলাবারুদ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বীর কুক পিছু হটেননি। গোলাবারুদহীন বিমান নিয়েই তিনি পাকিস্তানি যুদ্ধবিমানের একেবারে পিছু ধাওয়া করতে থাকেন এবং সেটিকে এতটাই কম উচ্চতায় উড়তে বাধ্য করেন যে চাপের মুখে পড়ে শেষ পাকিস্তানি পাইলট বাধ্য হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে পালিয়ে যায়।

কলাইকুন্ডা বায়ুঘাঁটি রক্ষা করার পাশাপাশি সেদিন আকাশেই শত্রুকে পরাস্ত করে তিনি কলকাতাকেও বড়সড় আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন বলে সামরিক বিশেষজ্ঞ মহলে আজও মনে করা হয়।

আলফ্রেড কুকের প্রয়াণে শোকপ্রকাশ করে ভারতীয় বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়েছে, কলাইকুন্ডার আকাশে তাঁর ঐতিহাসিক লড়াই ছিল অদম্য সংকল্প ও আগ্রাসী বিমানযুদ্ধের এক অনন্য ও চিরস্মরণীয় উদাহরণ। দেশ সর্বদা তাঁর এই আত্মত্যাগ ও বীরত্বকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।