উত্তরাখণ্ডের তুষারঝড়ে বিপন্ন বাংলার ৫ সহ ৮ ট্রেকার! বরফের গ্রাসে নিখোঁজ অভিযাত্রীদের উদ্ধারে মেগা অপারেশন!

উত্তরাখণ্ডের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে ট্রেকিং করতে গিয়ে ভয়াবহ তুষারঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হয়ে গেলেন একই অভিযাত্রী দলের আটজন সদস্য। এই মর্মান্তিক ঘটনায় গোটা রাজ্যজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজ আটজনের মধ্যে পাঁচজনই পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বাসিন্দা। বাকি তিনজনের মধ্যে দু’জন উত্তরপ্রদেশের লখনউ এবং একজন উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে। পাহাড়ে বরফঝড়ের কবলে পড়ার পর থেকে নিখোঁজদের সঙ্গে পরিবারের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় স্বজনহারাদের বুকফাটা কান্নায় আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, নিখোঁজ তরুণদের জীবন নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ ও আশঙ্কা ততই বেড়েই চলেছে।

প্রশাসন ও পারিবারিক সূত্রে প্রাপ্ত খবরে জানা গিয়েছে, বাঁকুড়ার যে পাঁচজন তরুণ এই বিপজ্জনক ট্রেকিং অভিযানে গিয়েছিলেন, তাঁরা হলেন— তাপস বাউরি, রতন ঘোষ, রিন্টু মণ্ডল, উদয় ঘোষ এবং মনোজ খাওয়াস। এর মধ্যে প্রথম চারজনের বাড়ি বাঁকুড়ার শালবনি গ্রামে এবং মনোজ কেশরা গ্রামের বাসিন্দা। গত ২৪ অক্টোবর তাঁরা আনন্দের সঙ্গে উত্তরাখণ্ডের উদ্দেশ্যে বাঁকুড়া ছেড়ে রওনা দিয়েছিলেন এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী চলতি মাসের শুরুতেই তাঁদের নিজ বাড়িতে ফিরে আসার কথা ছিল। জানা গিয়েছে, মোট বারোজন অভিযাত্রীর একটি দল গঙ্গোত্রী থেকে কেদারতাল পর্যন্ত ট্রেকিং করার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছিল। এই দলে চারজন শেরপা ও সহকারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে গঙ্গোত্রীর বেস ক্যাম্প থেকে তাঁরা রওনা দেওয়ার পর পাহাড়ি পথের প্রায় ৪ হাজার মিটার উচ্চতায় পৌঁছাতেই আচমকা মারাত্মক তুষারঝড়ের মুখোমুখি হন।

ভয়াবহ সেই বরফঝড়ের কবলে পড়ে দলটির অধিকাংশ সদস্যই নিখোঁজ হয়ে পড়েন। কোনোক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে দলের সঙ্গে থাকা চারজন শেরপা ও সহকারী গত ৩০ অক্টোবর গন্তব্যে পৌঁছাতে সক্ষম হন এবং সেখানেই তাঁরা বাকি আটজন সদস্যের নিখোঁজ হওয়ার মর্মান্তিক খবরটি জানান। এরপরই নড়েচড়ে বসে উত্তরাখণ্ড রাজ্য প্রশাসন। তক্ষণাৎ শুরু হয় উদ্ধারকাজ। উত্তরাখণ্ড সিভিল অ্যাভিয়েশন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির বিশেষ হেলিকপ্টারের সাহায্য নিয়ে উত্তরাখণ্ড স্টেট ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স বা এসডিআরএফ (SDRF)-এর বিশেষজ্ঞ দল গত দুই দিন ধরে হিমালয়ের সুউচ্চ ও দুর্গম অঞ্চলে চষে বেড়ালেও এখনও পর্যন্ত ওই আটজন নিখোঁজ ট্রেকারের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, উচ্চ হিমালয়ের ওই নির্দিষ্ট এলাকায় আবহাওয়া অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় এবং ঘন ঘন বরফাবৃত ঝড়বৃষ্টির কারণে তল্লাশি অভিযানে বারবার মারাত্মক বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

এই হাই-প্রোফাইল নিখোঁজ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা তথা বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি একটি বিশেষ বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই উত্তরাখণ্ড সরকার এবং এসডিআরএফ-এর সঙ্গে নিরন্তর যোগাযোগ রেখে চলেছে। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত রাজ্য সরকারের রেসিডেন্ট কমিশনারের কার্যালয় এবং রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা দপ্তরের মাধ্যমে নিখোঁজ যুবকদের খুঁজে বের করতে যে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চলছে, তার প্রতিমুহূর্তের আপডেট নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া বাঁকুড়া জেলার পুলিশ সুপার এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক স্তরের আধিকারিকদের উত্তরাখণ্ডের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখার বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাঁকুড়া জেলা প্রশাসন নিখোঁজ তরুণদের পরিবারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত ধরনের লজিস্টিক ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করছে।

এদিকে, পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন যে, পাহাড়ে পৌঁছানোর পর প্রথম কদিন নিয়মিত কথাবার্তা চললেও গত দু-তিন দিন ধরে তাঁদের সঙ্গে ফোনের মাধ্যমে আর কোনো যোগাযোগই করা সম্ভব হচ্ছে না। সবার ফোনই সুইচড অফ রয়েছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝে এই ভয়াবহ তুষারঝড় নাকি অন্য কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা—কী কারণে তাঁদের এই মর্মান্তিক পরিণতি হলো, তা ভেবেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পরিজনেরা। অনিশ্চয়তার ঘোর কালো মেঘে আচ্ছন্ন বাঁকুড়ার এই পরিবারগুলোর প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে চরম বুকভাঙ্গা কান্নায় ও উৎকণ্ঠায়। নিখোঁজ সমস্ত অভিযাত্রীকে দ্রুত অক্ষত ও সুস্থ শরীরে ফিরিয়ে আনতে প্রার্থনা করছেন দেশবাসী।