দীপাবলির কোন দিনে ঠিক কতগুলি প্রদীপ জ্বালালে খুলবে ভাগ্যের তালা? জানুন জাদুকরী রহস্য!

আর মাত্র কয়েক দিন পরেই বাঙালির ঘরে ঘরে কড়া নাড়তে চলেছে আলোর উৎসব দীপাবলি। আলোর এই মহা উৎসব মানেই বাঁধভাঙা আনন্দ, উল্লাস এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে সুন্দরকে সাদরে বরণ করে নেওয়া। কার্তিক মাসের এই বিশেষ উৎসবের প্রতিটি দিনের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব। এই পবিত্র দিনগুলিতে নির্দিষ্ট সংখ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর প্রাচীন প্রথা চলে আসছে, যার পেছনে লুকিয়ে রয়েছে অত্যন্ত গভীর আধ্যাত্মিক ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় কারণ। আসুন জেনে নেওয়া যাক কোন দিনে ঠিক কতগুলি প্রদীপ জ্বালানো বাধ্যতামূলক।
প্রথমেই আসা যাক ধনতেরাসের কথায়। আগামী ৬ নভেম্বর, শুক্রবার পালিত হবে ধনতেরাস। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে এই উৎসব পালিত হয় বলেই এই দিনে মোট ১৩টি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম প্রদীপটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মৃত্যুর দেবতা যমরাজের উদ্দেশ্যে দক্ষিণ মুখ করে জ্বালাতে হয়। পরিবারের সদস্যদের সমস্ত বিপদ ও অকালমৃত্যু থেকে রক্ষা করতেই এই নিয়ম মানা হয়। পাশাপাশি, সুস্বাস্থ্য, মা লক্ষ্মী ও ধনদেবতা কুবেরকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে বাকি প্রদীপগুলি জ্বালানো হয়। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ১৩টি প্রদীপ বছরের ১৩টি চন্দ্র মাস বা ১৩টি জীবনীশক্তিরও সরাসরি প্রতীক।
এর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ ৭ নভেম্বর, শনিবার পালিত হবে ভূত চতুর্দশী, যা বাংলার অনেক জায়গায় ‘ছোট দীপাবলি’ বা হ্যালোউইন হিসেবেও পরিচিত। এই বিশেষ দিনে বাড়িতে মোট ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র রাতে আমাদের ১৪ জন্মের পূর্বপুরুষ মর্ত্যে নেমে আসেন তাঁদের বংশধরদের আশীর্বাদ করতে। যেহেতু দিনটি চতুর্দশী তিথির, তাই ১৪টি প্রদীপ জ্বেলে পূর্বপুরুষদের শান্তির উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয়। এর পাশাপাশি এই দিন ১৪ রকমের শাক খাওয়ারও বাঙালি ঐতিহ্য রয়েছে।
এরপর আসে মূল দীপাবলি উৎসব, যা আগামী ৯ নভেম্বর, সোমবার উদযাপিত হবে। এই দিন ধন-সম্পদের দেবী মা লক্ষ্মী ও ভগবান গণেশের পুজো হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকারে মা লক্ষ্মী মর্ত্যলোকে নেমে আসেন। তাঁকে স্বাগত জানাতে ও ঘরের প্রতিটি অন্ধকার কোণ আলোকিত করতে ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। ত্রেতাযুগে লঙ্কা জয়ের পর ১৪ বছরের বনবাস শেষ করে এই দিনেই শ্রীরামচন্দ্র, সীতা ও লক্ষণ অযোধ্যায় ফিরেছিলেন। অযোধ্যাবাসী প্রদীপের আলোয় পুরো নগরী সাজিয়েছিলেন। এর আগের দিন অর্থাৎ রবিবার বাংলায় মহাসমারোহে কালীপুজো পালিত হবে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে যে দীপাবলিতে কেন ২১টি প্রদীপই জ্বালানো হয়, ২২টি কেন নয়? এর পেছনে রয়েছে এক গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা। আমাদের মানবদেহ গঠিত হয়েছে ২১টি মৌলিক উপাদান দিয়ে—৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক), ৫টি কর্মেন্দ্রিয় (হাত, পা, মুখ, মলদ্বার, জননাঙ্গ), ৫টি প্রাণ (শরীরের ভিতরের ৫টি বায়ু), ৫টি উপাদান বা পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম অর্থাৎ মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ) এবং ১টি মন বা আত্মা। এই ২১টি উপাদানের শুদ্ধিকরণ করার উদ্দেশ্যেই ২১টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, সংখ্যার বিচারে ২১ এর যোগফল হয় ৩, যা দেবগুরু বৃহস্পতির সংখ্যা। প্রদীপের আলো ও শুভ সংখ্যার প্রভাবে ঘরের বাস্তুদোষ কেটে ইতিবাচক শক্তির সঞ্চার হয়।
সবশেষে ১১ নভেম্বর, বুধবার পালিত হবে ভাইফোঁটা। এই পবিত্র দিনে ৫টি প্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম রয়েছে। এই ৫ প্রদীপ আসলে পঞ্চভূতের প্রতীক, যা ভাইয়ের রক্ষাকর্তা হিসেবে কাজ করে। মানবদেহে ৫টি জীবনীশক্তি বা প্রাণের দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও তেজ কামনা করে দিদি বা বোনেরা এই প্রদীপ জ্বালান। অনেকে মনে করেন, এই ৫ প্রদীপ উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম এবং আকাশ—এই পাঁচ দিক থেকে আসা সমস্ত বিপদ থেকে ভাইকে রক্ষা করে। পরিশেষে বলা যায়, প্রদীপের মাটির আধার আমাদের নশ্বর দেহ, তেল বা ঘি আমাদের কর্ম এবং তুলোর বাতি আমাদের অহংকার ও আত্মাকে নির্দেশ করে। প্রদীপ জ্বালানোর মাধ্যমে অজ্ঞানতা দূর করে জ্ঞানের আলো ছড়ানোই এর মূল তাৎপর্য।