আমেরিকায় সর্ষের তেল কেন নিষিদ্ধ? হার্টের জন্য কি সত্যিই এটি বিপজ্জনক?

বাঙালি রান্নায় সর্ষের তেলের ঝাঁঝালো গন্ধ ছাড়া যেন স্বাদই জমে না। তবে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই তেল আমেরিকায় নিষিদ্ধ। সেখানকার বাজারে সর্ষের তেলের বোতলের গায়ে লেখা থাকে—‘For external use only’ বা শুধুমাত্র বাহ্যিক ব্যবহারের জন্য। প্রশ্ন উঠছে, যে তেল ভারতে হাজার হাজার বছর ধরে স্বাস্থ্যকর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা কি সত্যিই হার্টের জন্য বিপজ্জনক?
নিষেধাজ্ঞার নেপথ্যে:
ইরুসিক অ্যাসিডের বিতর্ক আমেরিকার ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA)-এর এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো ‘ইরুসিক অ্যাসিড’ (Erucic acid)। ১৯৭০-এর দশকে ইঁদুরের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে, উচ্চমাত্রার ইরুসিক অ্যাসিড হৃদপেশীতে চর্বি জমতে সাহায্য করে, যা ‘মায়োকার্ডিয়াল লিপিডোসিস’ ডেকে আনতে পারে। এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই আমেরিকা ও অনেক পশ্চিমা দেশ সর্ষের তেলকে রান্নার উপাদান হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
বিপরীত ছবি ও বাস্তব তথ্য:
যদিও আমেরিকায় সর্ষের তেল নিষিদ্ধ, তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হৃদরোগে মৃত্যুর হার বিশ্বে অন্যতম। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি ৩৪ সেকেন্ডে আমেরিকায় একজন হৃদরোগে মারা যান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদরোগের জন্য সর্ষের তেল দায়ী নয়, বরং মার্কিন জীবনযাত্রা—অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনি, ট্রান্স ফ্যাট এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাবই এর মূল কারণ।
সর্ষের তেলের উপকারিতা:
অনেক পুষ্টিবিদের মতে, সর্ষের তেল বরং হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারী। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনই স্বীকার করে যে, এই তেলে মনোস্যাচুরেটেড (MUFA) ও পলিআনস্যাচুরেটেড (PUFA) ফ্যাটি অ্যাসিডের এক চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। এটি ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সহায়তা করে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত ‘কোল্ড-প্রেসড’ বা কাচ্চি ঘানি সর্ষের তেল পরিশোধিত বা রিফাইন্ড তেলের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টিকর। এতে থাকা প্রদাহরোধী (Anti-inflammatory) এবং জীবাণুরোধী গুণাবলী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক।
তবে কি আমেরিকা ভুল পথে?
বিজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন, ইঁদুরের ওপর করা সেই পুরনো গবেষণার ফলাফল মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা বিজ্ঞানসম্মত নয়, কারণ ইঁদুরগুলোকে অত্যধিক মাত্রায় অ্যাসিড খাওয়ানো হয়েছিল। মজার বিষয় হলো, বর্তমানে আমেরিকায় যে ‘ক্যানোলা তেল’কে অত্যন্ত নিরাপদ বলে ধরা হয়, তা মূলত সর্ষের জাতীয় উদ্ভিদ থেকেই উদ্ভূত, যেখানে ইরুসিক অ্যাসিডের মাত্রা কমিয়ে ফেলা হয়েছে।
সম্পাদকের পরামর্শ: ভারতে ঐতিহাসিকভাবে পরিমিত সর্ষের তেলের ব্যবহার হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়নি, বরং বহু ক্ষেত্রে তা উপকারে এসেছে। তবে যেকোনো তেলের অতিরিক্ত ব্যবহারই ক্ষতিকর হতে পারে। যারা সর্ষের তেল নিয়মিত ব্যবহার করেন, তারা সর্বদা খাঁটি ‘কাচ্চি ঘানি’ তেল বেছে নিন এবং পরিমিত পরিমাণে ব্যবহারের অভ্যাস বজায় রাখুন।