আইনের ছাত্রছাত্রীদের শাস্তি দেওয়ার কোনো অধিকার নেই বিসিআইয়ের! সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ে জোর ধাক্কা কার?

আইনের শিক্ষার্থীদের আচরণ বা শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো ধরনের বিধিবদ্ধ বা আইনি ক্ষমতা ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ (BCI)-র নেই বলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার দেশের শীর্ষ আদালত এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়ে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে যে, আইন পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হলে, তা একমাত্র সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেই তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিয়ম-কানুন এবং প্রবিধান অনুযায়ী গ্রহণ করতে হবে। এই রায়ের ফলে দেশের আইনি শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এক সুদূরপ্রসারী ও বড়সড় আইনি বার্তা দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহন-কে নিয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি বিশেষ ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় প্রদান করেছে। হায়দ্রাবাদের বিখ্যাত ‘নালসার ইউনিভার্সিটি অফ ল’ (NALSAR)-এর শিক্ষার্থীদের একটি বিতর্ক সংক্রান্ত মামলার শুনানি চলাকালীন শীর্ষ আদালত এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশ জারি করে। প্রসঙ্গত, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির প্রস্তাবিত অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিলেন নালসারের আইন শিক্ষার্থীরা।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতেই আইন পেশা এবং আইনি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী সংবিধিবদ্ধ সংস্থা ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ গত মাসে একটি বিতর্কিত নির্দেশ জারি করেছিল। সেই নির্দেশিকায় বলা হয়েছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতির অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অপরাধে ‘নালসার’-এর ২০২৬ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের যেন আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত বা নথিভুক্ত না করা হয়। এই নির্দেশ জারির পরই দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তীব্র জনরোষ ও সমালোচনার মুখে পড়ে ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’ শেষ পর্যন্ত সেই বিতর্কিত নির্দেশ প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হয় এবং সংস্থার চেয়ারম্যান মানন কুমার মিশ্র শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমাও প্রার্থনা করেন।
এদিনের শুনানিতে আদালতের বেঞ্চ নালসার সংক্রান্ত এই গোটা বিতর্কের জেরে ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’-র জারি করা সমস্ত বিজ্ঞপ্তি সম্পূর্ণ খারিজ ও বাতিল করে দেয়। যদিও এই বিজ্ঞপ্তিগুলি জারির মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিসিআই নিজে থেকে তা তুলে নিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্পষ্ট করে দেয় যে, আইন পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা তালিকাভুক্তি আটকে দেওয়ার কোনো একচ্ছত্র ক্ষমতা বার কাউন্সিলের নেই। আদালত বিশেষভাবে উল্লেখ করে যে, আইন শিক্ষার্থীরা যখন আইন মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করে আইনজীবী হিসেবে অফিশিয়ালি তালিকাভুক্ত হন, তবেই কেবল তাদের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আইনি এখতিয়ার কাউন্সিলের হাতে আসে।
রায়দানকালে শীর্ষ আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানায় যে, “আমাদের সুচিন্তিত মতে, ‘অ্যাডভোকেটস অ্যাক্ট, ১৯৬১’—যার অধীনে ‘বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া’-কে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গঠন করা হয়েছে, সেই আইনে বিসিআই বা কোনো রাজ্যের বার কাউন্সিলকে আইন পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের একমাত্র পূর্বশর্ত হলো উক্ত আইনের অধীনে সংশ্লিষ্ট আইন স্নাতকের আইনজীবী হিসেবে যথাযথভাবে নথিভুক্ত হওয়া।”
বেঞ্চ আরও যোগ করে স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে, “শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাভঙ্গ বা অসদাচরণের ক্ষেত্রে, একমাত্র তাদের মূল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সেই প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট প্রবিধান কিংবা উপবিধি অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের যোগ্য। আমরা ১৩ আগস্টের সমস্ত যোগাযোগ অথবা পরবর্তী সংশোধিত যোগাযোগকে সম্পূর্ণভাবে আইনগত বৈধতাহীন বলে ঘোষণা করছি এবং আমাদের পূর্বের সমস্ত অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশাবলী এই রায়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হলো।”