অপরাধের দুনিয়া ছেড়ে সোজা মূলস্রোতে! বন্দিদের পুনর্বাসনে ঐতিহাসিক নিয়ম চালু করতে চলেছে সরকার!

ঝাড়খণ্ড সরকারের পক্ষ থেকে এক অত্যন্ত অভিনব ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে জেলবন্দি থেকেও সাধারণ মানুষের মতো বাইরে গিয়ে কাজ করার সুযোগ পাবেন বন্দিরা। প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে জেল থেকে বেরিয়ে নিজেদের কর্মস্থলে যেতে পারবেন তাঁরা। সারাদিন সেখানে কাজ শেষ করে সন্ধ্যার মধ্যে আবার ফিরে আসতে হবে কারাগারের ভেতরে। বন্দিদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলা এবং সমাজের মূলস্রোতে সফলভাবে পুনর্বাসিত করার উদ্দেশ্যেই এই ব্যতিক্রমী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ঝাড়খণ্ড সরকার (Jharkhand Government)।

আপাতত এই অভিনব বন্দোবস্ত চালু করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, সকাল ৬টা কিংবা ৭টা নাগাদ বন্দিদের জেলের বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে শর্ত অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের পুনরায় বাধ্যতামূলকভাবে জেলে ফিরে আসতে হবে। এই বিশেষ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই নয়, বরং বন্দিরা যাতে নিজেরা কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারেন এবং নিজেদের পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারেন, সেই সুব্যবস্থা করা। এর ফলে সাজা শেষ হওয়ার পর যখন তাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন, তখন সমাজে নতুন করে মাথা উঁচু করে বাঁচার আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাবেন।

কারা এই বিশেষ সুযোগের আওতায় আসবেন, তা নিয়েও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করছে প্রশাসন। জেলের সমস্ত বন্দি এই সুবিধা পাবেন না। কোন কোন বন্দি বাইরে গিয়ে কাজ করার যোগ্য, তার জন্য খুব শীঘ্রই একটি কঠোর ও স্পষ্ট গাইডলাইন বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করা হবে। জেলের ভেতরে যাঁদের আচার-আচরণ সম্পূর্ণ সন্তোষজনক এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে কোনও ধরনের নিয়মভঙ্গের রেকর্ড নেই, মূলত সেই সমস্ত ভালো বন্দিদেরই এই ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসার কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি, বাইরে কর্মরত বন্দিদের গতিবিধির ওপর কড়া নজরদারি চালাবে কারা প্রশাসন। কোনও কারণে নিয়মভঙ্গের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বন্দির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে ঝাড়খণ্ডের মোট চারটি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে এই ব্যবস্থা চালুর পূর্ণ প্রস্তুতি চলছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করতে ওই সমস্ত জেলে ‘ওপেন’ এবং ‘সেমি-ওপেন’ ব্যারাক তৈরি করা হবে। যে চারটি কেন্দ্রকে এই পাইলট প্রজেক্টের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল—রাঁচির বিরসা মুন্ডা সেন্ট্রাল জেল, হাজারিবাগের জয়প্রকাশ নারায়ণ সেন্ট্রাল জেল, পূর্ব সিংভূমের ঘাঘিডিহ সেন্ট্রাল জেল এবং দুমকার দুমকা সেন্ট্রাল জেল। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট চারটি জেলের নির্দিষ্ট কিছু ব্যারাক ও সেল চিহ্নিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলিকে আধুনিক ওপেন বা সেমি-ওপেন ব্যারাকে রূপান্তর করার কাজ চলছে।

কারা বিভাগের আইজি সুদর্শন মণ্ডলের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চারটি কেন্দ্রীয় কারাগারই শহরাঞ্চলের ঠিক মাঝখানে বা অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থিত। এর ফলে বন্দিদের জেলের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন কর্মসংস্থান বা জীবিকা অর্জনের সুযোগ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি থাকবে। দেশের কারা সংস্কারের বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেই এই ঐতিহাসিক ব্যবস্থা চালু হতে চলেছে। বন্দিদের প্রকৃত অর্থে পুনর্বাসন দেওয়া এবং তাঁদের অপরাধের পথ থেকে ফিরিয়ে এনে সমাজের ভালো নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য। সাজা শেষ হওয়ার আগেই যদি যোগ্য বন্দিরা কাজের সুযোগ পান, তবে তাঁদের মানসিক পরিবর্তন ঘটে।

ঝাড়খণ্ড সরকারের এই বিশেষ কল্যাণমুখী উদ্যোগের শক্ত আইনি ভিত্তিও রয়েছে। নতুন প্রণীত ‘ঝাড়খণ্ড প্রিজন অ্যান্ড কারেকশনাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট, ২০২৫’-এর অধীনে ওপেন কারেকশনাল ইনস্টিটিউশনস বা ওসিআই (OCI) তৈরির আইনি সংস্থান রাখা হয়েছে। তবে বন্দিদের কাজের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত নিয়ম ও শর্তগুলি কী হবে, তা সম্পূর্ণভাবে এসওপি (SOP)-র মাধ্যমেই স্পষ্ট করা হবে। আপাতত নির্বাচিত চারটি কেন্দ্রীয় জেলে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে।