অতিবৃষ্টিতে কৃষিভূমি ডুবন্ত! চরম সংকটে মধ্যবিত্তরা, অগ্নিমূল্য সবজি বাজার

মধ্যবিত্তের রান্নাঘরে এখন নীরব আর্তনাদ। এক সপ্তাহ আগেও যে সবজি ছিল পাতের নিত্যসঙ্গী, জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে তা কার্যত বিলাসবস্তুতে পরিণত হয়েছে। কলকাতার বাজারে এখন ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। চিচিঙ্গা থেকে বেগুন, পটল থেকে কাঁচা লঙ্কা – সবকিছুর দাম যেন আকাশ ছুঁয়েছে, যা সাধারণ মানুষের পকেট পুড়িয়ে ছারখার করছে।

দামের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন: কিছু দৃষ্টান্ত
চিচিঙ্গা: মাত্র দেড়-দুই সপ্তাহ আগে যা ২০-২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, এখন তার দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। এই সহজলভ্য ও সস্তা সবজিও এখন বিরল।

বেগুন: বাঙালির রান্নাঘরের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই বেগুন এখন কার্যত বিলাসের প্রতীক। জুলাইয়ের শুরুতে যা ৬০-৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছিল, সাধারণ মানের বেগুন এখন ১০০-১২০ টাকা কেজি। ভালো মানের বেগুন ১৫০-১৭০ টাকা, এবং সেরা গুণমানের বেগুন ২০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

শুধু এই দুটি নয়, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা লঙ্কার দামও ঊর্ধ্বমুখী, যা দৈনন্দিন বাজেটকে আরও চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

কেন এই হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধি?
বর্ষাকালে সবজির দাম কিছুটা বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। এর প্রধান কারণ হলো পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডে অতিবর্ষণ, যার ফলে বহু কৃষিভূমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, হুগলি এবং হাওড়ার বিস্তীর্ণ অংশের চাষের জমি জলের নিচে তলিয়ে গেছে। বহু ক্ষেতের সবজি পচে নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে চাষিরা বাধ্য হয়ে আধা-পাকা অবস্থাতেই সবজি তুলে ফেলছেন, যাতে কিছুটা হলেও ক্ষতি কমানো যায়।

শুধু এই কয়েকটি জেলা নয়, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদিয়াতেও অতিবৃষ্টির কারণে ফলন মারাত্মকভাবে কমেছে। রাজ্যের কৃষি ও উদ্যানপালন দপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, এই জেলাগুলিই দক্ষিণবঙ্গ ও কলকাতার প্রধান সবজির জোগানদাতা। ফলে এই অঞ্চলগুলিতে উৎপাদনে টান পড়লে তার সরাসরি প্রভাব বাজারে দেখা যায়।

জোগান কম, চাহিদা বেশি: পরিবহণ খরচও বাড়ছে
এখন বাজারে সবজির জোগান অপ্রতুল, অথচ চাহিদা আগের মতোই রয়েছে। এই ভারসাম্যহীনতার কারণেই দামের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সবজির সরবরাহ ঘাটতি মেটাতে ওড়িশা, বিহার বা ছত্তীসগড়ের মতো রাজ্যের বাইরে থেকেও সবজি আনতে হচ্ছে। এতে পরিবহণ খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতাদের উপরই পড়ছে।

মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা
প্রতিদিন বাজারে গিয়ে এখন ‘গরমে ঘাম’ নয়, ‘দামে ঘাম’ ঝরছে। একটি চারজনের পরিবারের পক্ষে প্রতিদিনের সবজি কিনতে গিয়ে তিন-চারশো টাকা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে, যা সীমিত আয়ের মানুষের পক্ষে রীতিমতো অসহনীয়।

রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো বিশেষ হস্তক্ষেপ বা দর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। যদিও কৃষি দপ্তর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্রের খবর। তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, “শুধু দেখে কী হবে, যদি পকেট থেকেই অতিরিক্ত টাকা যাচ্ছে?” সবজি বাজারের এই আগুন আর কবে নেভে, তা এখনও অনিশ্চিত। বর্ষা থামলে যদি কিছুটা স্বস্তি আসে, তাও আরও কিছু সপ্তাহ অপেক্ষা করতেই হবে। ততদিন পর্যন্ত, রান্নাঘরে মেনু ঠিক করতে গিয়ে প্রতিটি টাকা হিসেব করে খরচ করতে হবে।