মাংসপেশিতে টান? স্রেফ ব্যথা নয়, কখন প্রয়োজন জরুরি চিকিৎসা?

খেলাধুলা, ব্যায়াম বা হঠাৎ করে ভারী কিছু তুলতে গিয়ে মাংসপেশিতে টান লাগাটা খুবই সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই টান কতটা গুরুতর হতে পারে, তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। পেশিতে অসহ্য ব্যথা, নাড়াচাড়ার অক্ষমতা—এসব সমস্যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় মাসল পুল, মাসল সোরনেস, স্ট্রেইন, স্প্রেইন, ক্র্যাম্প বা স্প্যাজম বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ল্যাকটিক অ্যাসিডের নিঃসরণের ফলেই এই জায়গায় জ্বালাপোড়া হয়।
মাংসপেশিতে টান পড়ার প্রধান কারণগুলো:
পেশিতে টান পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রধান কারণ হলো:
শরীরের কোনো একটি মাংসপেশি দীর্ঘক্ষণ ধরে অতিরিক্ত ব্যবহৃত হলে।
ব্যায়াম, খেলাধুলা বা যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে ওয়ার্মআপ বা শরীর গরম না করলে।
পেশী ক্লান্ত থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে নড়াচড়া করলে।
হঠাৎ করে অতিরিক্ত ভারী কিছু উঠালে।
পেশীর অতিরিক্ত ও অনুপযুক্ত ব্যবহার।
মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা।
অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে জল কম পান করলে এবং শরীরে সোডিয়াম ও পটাশিয়ামের অভাব দেখা দিলে মাংসপেশিতে টান পড়তে পারে।
কখন জরুরি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ?
ফিজিওথেরাপিস্ট বিশেষজ্ঞরা কিছু গুরুতর লক্ষণের কথা বলেছেন, যা দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া উচিত। এগুলো হলো:
মাংসপেশিতে অতিরিক্ত ব্যথা হলে।
ব্যথার কারণে জ্বর উঠে গেলে।
কয়েকদিন পরও ব্যথা না কমলে বা বেড়ে গেলে।
মাংসপেশির ফোলা না কমলে বা বাড়লে।
শ্বাস নিতে কষ্ট হলে।
মাথা ঘুরতে থাকলে।
শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে কাঁপতে থাকলে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, মাসল পুল হওয়ার পর যদি পেশীর ওই অংশ টানটান করতে গিয়ে ব্যথা পান, তাহলে সেই চেষ্টা আর করা যাবে না। এতে পরিস্থিতি হিতে বিপরীত হতে পারে।
প্রাথমিক চিকিৎসা: রাইস থেরাপি
প্রাথমিক অবস্থায় ক্ষতস্থানে তাৎক্ষণিক ব্যথা কমানোর জন্য এনেস্থেটিক ক্রিম, জেল বা স্প্রে ব্যবহার করা যায়। পরিস্থিতি সাপেক্ষে ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। তবে মাংসপেশিতে টান পড়লে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবার তথ্য অনুযায়ী, মাংসপেশিতে টান লাগার প্রথম কয়েকদিন চারটি ধাপে এর চিকিৎসা করতে হয়, যাকে সংক্ষেপে রাইস থেরাপি (RICE Therapy) বলা হয়। এর মাধ্যমে ব্যথা অনেকটাই কমিয়ে আনা যায়:
রেস্ট (Rest) বা বিশ্রাম: এই সময়টাতে সব ধরনের শারীরিক ব্যায়াম বা ক্রিয়াকলাপ বন্ধ রাখতে হবে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে কোনো ওজনও নেওয়া যাবে না।
আইস (Ice) বা বরফ: আঘাতের স্থানে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পরপর ২০ মিনিটের জন্য বরফের ব্যাগ দিয়ে রাখুন।
কমপ্রেশন (Compression) বা সংকোচন: আঘাতপ্রাপ্ত স্থানটির নাড়াচাড়া নিয়ন্ত্রণে একটি ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়িয়ে নিতে হবে।
এলিভেট (Elevate) বা উঁচু করা: অর্থাৎ আঘাতের স্থানটি যতটা সম্ভব বালিশের উপরে উঠিয়ে রাখতে হবে।
এছাড়া কিছু সতর্কতা মেনে চলতে হবে। আঘাত পাওয়ার প্রথম কয়েকদিন ওই স্থানে গরম সেক বা গরম জল দেওয়া যাবে না। আঘাতের স্থানে কোনো অবস্থাতেই মালিশও করা যাবে না।
যখন ক্ষতস্থানটি স্বাভাবিকভাবে নাড়াচাড়া করতে পারবেন এবং ব্যথা কমে যাবে, তখন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক কাজ করার চেষ্টা করুন। নাড়াচাড়া করার চেষ্টা করুন যাতে জয়েন্ট বা পেশী শক্ত না হয়ে যায়।
মাংসপেশীর টান এড়ানোর উপায়:
যেকোনো শারীরিক কসরতের আগে বা ভারী কিছু তোলার আগে অবশ্যই ওয়ার্মআপ করে মাংসপেশিগুলোকে সচল করে নিন।
নিয়মিত ব্যায়াম করুন।
দীর্ঘক্ষণ এক জায়গায় বসে না থেকে, ৪০ মিনিট বা এক ঘণ্টা পর পর কয়েক মিনিট পায়চারি করুন।
প্রচুর জল পান করুন এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখুন।