চিরঘুমে নব্বইয়ের জনপ্রিয় পরিচালক অমল রায় ঘটক! ক্যানসারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক পরিচিত ও বর্ণময় অধ্যায়ের চিরতরে অবসান ঘটল। নব্বইয়ের দশকের বিশিষ্ট বাংলা চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার অমল রায় ঘটক আর নেই। দীর্ঘদিন ধরে মারণ ক্যানসার রোগের সঙ্গে লড়াই করার পর শনিবার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর এই প্রয়াণের খবর সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর ভাই তথা বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী অলোক রায় ঘটক। পরিচালকের মৃত্যুর খবরে গোটা টলিপাড়া ও সাংস্কৃতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরেই গুরুতর ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন অমল রায় ঘটক। সম্প্রতি তাঁর কেমোথেরাপি পর্ব প্রায় শেষের পথে ছিল এবং চিকিৎসায় কিছুটা ইতিবাচক সাড়া দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থও হয়ে উঠছিলেন বলে পরিচিত মহলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষরক্ষা আর হলো না। ক্যানসারের সঙ্গে তাঁর এই দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি ঘটল শনিবার দুপুরে।
নব্বইয়ের দশকের বাংলা বাণিজ্যিক ছবির জগতে তিনি নিজের এক স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট পরিচিতি তৈরি করেছিলেন। সেই সময় যখন টলিউডে মূলত অ্যাকশন ও মারকাটারি বাণিজ্যিক ছবির একচ্ছত্র দাপট চলছিল, ঠিক তখনই তিনি স্রোতের বিপরীতে হেঁটে সম্পূর্ণ মননশীল গল্প, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং এক ভিন্নধারার বিষয়বস্তুকে নিজের ছবির মূল উপাদান হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলিতে একদিকে যেমন তৎকালীন খ্যাতনামা তারকারা অভিনয় করেছেন, তেমনই তিনি ছোট পর্দার বহু প্রতিভাবান টেলিভশনের অভিনেতাদেরও বড় পর্দায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়েছিলেন।
অমল রায় ঘটকের পরিচালিত উল্লেখযোগ্য ছবির দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে ‘উজান’, যেখানে অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন সুপ্রিয়া দেবী, রূপা গাঙ্গুলি ও দোলন রায়ের মতো জনপ্রিয় অভিনেত্রীরা। এছাড়া লাবণী সরকার ও ইন্দ্রাণী হালদার অভিনীত ‘কাঁচের পৃথিবী’ তাঁর পরিচালিত অন্যতম বাণিজ্যিক ও সমাদৃত ছবি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। পাশাপাশি তাপস পাল ও ইন্দ্রাণী হালদার অভিনীত ‘দেবর’ এবং রঞ্জিত মল্লিক, রিনা চৌধুরী ও চুমকি চৌধুরী অভিনীত ‘শ্রীমান ভূতনাথ’ ছবিগুলি দর্শকদের মনে আজও গভীরভাবে দাগ কেটে রয়েছে।
পরিচালনার পাশাপাশি একজন দক্ষ চিত্রনাট্যকার হিসাবেও তিনি বাংলা চলচ্চিত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। সৌমিত্র চ্যাটার্জি ও রূপা গাঙ্গুলি অভিনীত সাড়া জাগানো ‘মানসী’ ছবির চিত্রনাট্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। এছাড়া মুনমুন সেন, ভিক্টর বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস পাল, সুমিত্রা মুখোপাধ্যায় ও কালী বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত ‘ব্যবধান’ ছবির চিত্রনাট্যও তাঁরই কলমের সৃষ্টি। এই ছবির আশা ভোঁসলের কণ্ঠে গাওয়া ‘কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন পুণ্য হল’ গানটি আজও দর্শকদের মুখে মুখে ফেরে। কিংবদন্তি তপন সিংহ, অরুন্ধতী দেবী এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে কাজ করার এক বর্ণময় অভিজ্ঞতা তাঁর ঝুলিতে ছিল। পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গেও তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও মধুর সম্পর্ক বজায় ছিল। তাঁর প্রয়াণে এক সোনালী যুগের চিরবিদায় ঘটল।