মিষ্টিতে ময়লা, খাবারে তেলাপোকা-মাছি! দীপাবলির আগে এফডিএ-র মেগা অভিযানে ফাঁস মুম্বইয়ের বিখ্যাত সব দোকানের আসল রূপ

দীপাবলি এবং উৎসবের মরশুম আসতেই বাজারজুড়ে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যদ্রব্য বিক্রির রমরমা কারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে চলা এই বিপজ্জনক খেলা রুখতে এবার কোমর বেঁধে আসরে নেমেছে মহারাষ্ট্রের খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (FDA)। রাজ্যজুড়ে একযোগে চালানো মেগা অভিযানে ৩৬টি খাদ্য প্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে প্রায় ৩৭.৫০ লক্ষ টাকার ভেজাল ও পচা খাদ্যসামগ্রী বাজেয়াপ্ত করেছে প্রশাসন। একই সঙ্গে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি নামী দোকান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মুম্বইয়ে ৫ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল:
এফডিএ-র এই সাঁড়াশি অভিযানে বৃহত্তর মুম্বইয়ের পাঁচটি প্রভাবশালী খাদ্য প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এই তালিকার মধ্যে রয়েছে— দাদর পশ্চিমের শীতলস (Sheetal’s), আন্ধেরি পূর্বের আইটিসি লিমিটেড (ITC Limited), মুলুন্ডের ধন্যা এন্টারপ্রাইজেস (গুপ্তা শেভ অ্যান্ড পুরি) এবং কান্দিভালি পূর্বের জিপ্টো লিমিটেড (Zepto Limited)। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও তৈরির সময় এই সমস্ত জায়গায় কঠোর স্বাস্থ্যবিধি বা পরিচ্ছন্নতার চরম অভাব দেখতে পান আধিকারিকরা।
বিশেষ করে বোরিভালির বিখ্যাত ভগবতী স্টোরসে পরিদর্শনের সময় যা দেখা গেছে, তা যেকোনো ক্রেতার বমিভাব ধরাতে যথেষ্ট। ওই দোকানের খাবারে সরাসরি তেলাপোকা, মাছি এবং নানা রকম ক্ষতিকর পোকামাকড় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়! এছাড়া পচা খাবার সংরক্ষণ, অনুপযুক্ত পরিবেশ এবং একটি ত্রুটিপূর্ণ ফ্রিজারের মতো গুরুতর ত্রুটিও ধরা পড়ে। এফডিএ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, লাইসেন্স স্থগিত থাকা অবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানগুলির কোনোটির পক্ষেই খাদ্য ব্যবসা চালানো সম্পূর্ণ আইনবিরুদ্ধ।
পুনে ও অমরাবতীতেও কড়া পদক্ষেপ:
শুধু মুম্বই নয়, পুনে বিভাগেও বুলডোজার নীতি নিয়েছে এফডিএ। শ্রী গণেশ লাড্ডু ওয়ালে (শিকরাপুর), পূর্ণিমা সুইটস (ভানওয়াড়ি) এবং সিরভি সুইটস (বিববেওয়াড়ি)-এর মতো জনপ্রিয় মিষ্টির দোকানগুলিকে কড়া বন্ধের নোটিশ ধরানো হয়েছে। এর মধ্যে ‘শ্রী গণেশ লাড্ডু ওয়ালে’ সম্পূর্ণ অবৈধ লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চালাচ্ছিল এবং সেখানে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সন্দেহজনক মিষ্টি তৈরি হচ্ছিল। অন্যদিকে, অমরাবতীতে মা ভগবতী মিঠাই এবং ফরাল কারখানার কার্যক্রমও সিল করে দেওয়া হয়েছে, কারণ সেখানে মিষ্টি ও ভাজার পণ্যে অননুমোদিত ক্ষতিকর রং ব্যবহারের জোরালো প্রমাণ মিলেছে।
জব্দ ১৪ হাজার কেজির বেশি খাবার ও গুটখা চক্রের পর্দাফাঁস:
রাজ্যব্যাপী এই অভিযানে মোট ১৪,৩৪০ কেজিরও বেশি ভেজাল খাদ্যসামগ্রী এবং ২০৪ লিটার কোকুম তেল জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৭,৪৯,৬১১ টাকা। বাজেয়াপ্ত করা পণ্যের তালিকায় রয়েছে— মতিচুর লাড্ডু, বুন্দি, হালুয়া, খোলা খোয়া, ঘি, পনির, ভোজ্য তেল, ময়দা, সুজি থেকে শুরু করে নানা ধরনের ফাস্ট ফুড ও মশলা।
পাশাপাশি, মহারাষ্ট্র সরকারের নিষিদ্ধ ঘোষণা করা গুটখা, পান মশলা ও সুগন্ধি তামাকের বিরুদ্ধেও সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে এফডিএ। কোঙ্কন ও পুনে বিভাগ থেকে প্রায় সাড়ে ১৭ লক্ষ টাকার নিষিদ্ধ তামাকজাত দ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এই ঘটনায় পুলিশ ইতিমধ্যে দুটি এফআইআর দায়ের করে ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং পাচারের কাজে ব্যবহৃত একটি গাড়িও জব্দ করেছে।
এফডিএ কমিশনারের কঠোর সতর্কবার্তা:
খাদ্য ও ঔষধ প্রশাসন (FDA)-এর কমিশনার তুকারাম মুন্ধে সমস্ত ব্যবসায়ী ও প্রস্তুতকারকদের কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, বৈধ লাইসেন্স এবং কঠোর পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখেই একমাত্র ব্যবসা করতে হবে। খাদ্যদ্রব্যের সংরক্ষণ, অননুমোদিত রঙের ব্যবহার এবং প্যাকেজিংয়ে সঠিক মেয়াদ বা ‘বেস্ট বিফোর’ ডেট দেওয়া অত্যন্ত বাধ্যতামূলক। নিম্নমানের ও ভেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে এই জিরো টলারেন্স নীতি আগামী দিনেও কঠোরভাবে বজায় থাকবে।
উৎসবের এই আনন্দময় দিনে সাধারণ ক্রেতাদের প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে সবসময় বিশ্বস্ত ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত দোকান থেকেই মিষ্টি বা খাদ্যদ্রব্য কেনার অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।