সারাক্ষণ ফোনে চোখ? অজান্তেই কোন মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনছেন জানেন কি?

আজকের ডিজিটাল যুগে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে বিছানায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমাদের চোখ প্রায় সারাক্ষণই কোনো না কোনো ডিজিটাল স্ক্রিনের দিকে ফিক্সড থাকে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে একটানা ফোন ব্যবহার করার পর চোখের মধ্যে তীব্র জ্বালাপোড়া, লাল হয়ে যাওয়া, জল পড়া কিংবা মাথা ব্যথার মতো সমস্যা কেন দেখা দেয়? চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চক্ষু বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে নানা গবেষণা চালিয়ে এর পেছনে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর কারণ খুঁজে পেয়েছেন। মূলত আমাদের চোখের স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া এবং ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলেই এই জটিলতা তৈরি হয়।
এর পেছনে সবচেয়ে বড় এবং প্রধান কারণ হলো চোখের পলক পড়ার স্বাভাবিক হার অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া। স্বাভাবিক অবস্থায় একজন মানুষ প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫ থেকে ২০ বার পলক ফেলেন, যা চোখকে সতেজ ও আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু যখনই আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে মোবাইল স্ক্রিন, ল্যাপটপ বা ট্যাবের দিকে তাকিয়ে থাকি, তখন আমাদের চোখের পলক পড়ার হার প্রায় অর্ধেকে বা তারও নিচে নেমে আসে। এর ফলে চোখের ওপরের পাতায় থাকা ল্যাক্রিমাল গ্ল্যান্ড থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে টিয়ার বা চোখের জল তৈরি হতে পারে না এবং চোখের কর্নিয়া শুকিয়ে যেতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’ (Digital Eye Strain) বা ‘কম্পিউটার ভিশন সিন্ড্রোম’ (Computer Vision Syndrome)।
এর পাশাপাশি মোবাইল স্ক্রিন থেকে নির্গত এক বিশেষ ধরণের ক্ষতিকর আলো এই সমস্যাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং কম্পিউটারের ডিসপ্লে থেকে ‘হাই এনার্জি ভিজিবল’ (HEV) লাইট বা যাকে আমরা সাধারণত নীল আলো (Blue Light) বলে জানি, তা অবিরাম নির্গত হতে থাকে। এই নীল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এবং শক্তিসম্পন্ন হওয়ায় তা চোখের কর্নিয়া ও লেন্স ভেদ করে সরাসরি সোজা রেটিনার ওপর গিয়ে আঘাত করে। দীর্ঘক্ষণ এই আলোর সংস্পর্শে থাকার ফলে চোখের অভ্যন্তরীণ পেশিগুলো চরমভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে চোখে জ্বালাপোড়া, ঝাপসা দেখা এবং তীব্র অস্বস্তি অনুভূত হয়।
এই সমস্যা থেকে চোখকে সুরক্ষিত রাখতে চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু সহজ কিন্তু কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, স্ক্রিন ব্যবহারের সময় ‘২০-২০-২০ নিয়ম’ (20-20-20 Rule) মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। অর্থাৎ প্রতি ২০ মিনিট অন্তর স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে অন্তত ২০ ফুট দূরে থাকা কোনো বস্তুর দিকে অন্তত ২০ সেকেন্ডের জন্য তাকিয়ে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ঘরের আলো ঠিক রেখে এবং স্ক্রিনের ব্রাইটনেস কমিয়ে কাজ করা উচিত। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ বা কৃত্রিম চোখের জল ব্যবহার করলে এই ধরনের জ্বালাপোড়া থেকে দ্রুত স্বস্তি পাওয়া সম্ভব। সচেতনতাই পারে আপনার মূল্যবান চোখকে অন্ধত্বের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে।