‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি মা ও দুই শিশু! ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বড় পদক্ষেপ নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিল হাইকোর্ট

কলকাতা হাইকোর্ট কোচবিহারের এক চাঞ্চল্যকর মামলায় নির্দেশ দিয়েছে যে, বাংলাদেশি সন্দেহে আটক এক মহিলা ও তাঁর দুই নাবালিকা মেয়েকে এখনই বাংলাদেশে পুশব্যাক করা যাবে না। কোচবিহারের বাসিন্দা ত্রিশোর্ধ্ব লেবু শেখ তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চক্রান্ত রুখতে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। পূজা অবকাশকালীন বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য এবং বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, যে কোনো নাগরিককে সন্দেহের বশে ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে সরাসরি পুশব্যাক করা বেআইনি।
আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী, লেবু শেখের স্ত্রী এবং তাঁর দুই নাবালিকা সন্তানকে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করতে হবে। পাশাপাশি, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করে আইনসম্মত উপায়ে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে এবং পরিবারটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে।
মামলার শুনানির সময় আবেদনকারীর আইনজীবী অনিন্দ্য ঘোষ আদালতের নজর আকর্ষণ করে জানান যে, গত ২১ অক্টোবর লেবুর স্ত্রী ও দুই সন্তান কোচবিহারের চ্যাংড়াবান্ধা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার পথে ছিলেন। তাঁর দাবি, তাঁদের কাছে সম্পূর্ণ বৈধ ভারতীয় পাসপোর্ট এবং ভিসা ছিল। এমনকি, ওই দম্পতির দুই শিশু সন্তান কোচবিহারের একটি স্থানীয় হাসপাতালেই জন্মগ্রহণ করেছে এবং তাদের জন্ম শংসাপত্রও রয়েছে।
আইনজীবীর অভিযোগ, এত সমস্ত বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন বিভাগ তাঁদের বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে আটক করে এবং সেদিনই দিনহাটা পুরসভার ‘আপন ঘর’ ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, পরিবারের লোকজন এই পুরো ঘটনাটি জানতে পেরেছিলেন ঘটনার সাত দিন পর, অর্থাৎ গত ২৮ অক্টোবর। কোনো ধরনের নির্দিষ্ট মামলা দায়ের না করেই তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছিল এবং নিম্ন আদালতে পেশ করা হয়নি। এমনকি বারবার তাঁদের জোর করে বাংলাদেশে পুশব্যাক করার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে।
অন্যদিকে, রাজ্যের পক্ষের আইনজীবী দাবি করেন যে লেবু শেখের স্ত্রী মূলত বাংলাদেশের নাগরিক এবং তিনি লেবু শেখকে বিবাহ করেছেন। রাজ্যের আইনজীবীর আরও দাবি, প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে যে দম্পতির জমা দেওয়া পাসপোর্ট ও ভিসাটি জাল।
তখন বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায় রাজ্যের আইনজীবীকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, আবেদনকারীর স্ত্রী যে পাসপোর্ট ও ভিসা আদালতে পেশ করেছেন, সেটি কি আদৌ জাল বলে প্রমাণিত হয়েছে? এর উত্তরে রাজ্যের আইনজীবী জানান যে প্রাথমিক তদন্তে তাঁদের সন্দেহ হচ্ছে। এই পর্যায়ে আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী পাল্টা আদালতকে জানান যে লেবুর স্ত্রী সম্পূর্ণ ভারতীয় নাগরিক, ইসলামি রীতি মেনে তাঁদের বিয়ে হয়েছে এবং তাঁদের কাছে বৈধ ম্যারেজ সার্টিফিকেটও রয়েছে।
বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য রাজ্যের আইনজীবীকে তীব্র ভর্ৎসনা করে প্রশ্ন তোলেন যে, যদি তাঁদের ডিটেনশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়ে থাকে, তবে এখনও পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে কেন কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়নি? এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি রাজ্যের আইনজীবী।
সব পক্ষের দীর্ঘ সওয়াল-জবাব শোনার পর বিচারপতি সব্যসাচী ভট্টাচার্য ও বিচারপতি অর্জুন রায় মুখোপাধ্যায়ের ডিভিশন বেঞ্চ কয়েকটি অত্যন্ত কড়া নির্দেশ জারি করেছে:
১. আটক লেবু শেখের স্ত্রী এবং তাঁর দুই সন্তানকে কোনো অবস্থাতেই বাংলাদেশে পুশব্যাক করা যাবে না।
২. আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটকদের বিরুদ্ধে যথাযথ মামলা দায়ের করে তাঁদের নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পেশ করতে হবে।
৩. পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় তাঁদের নিজেদের পক্ষে সওয়াল করার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে।
৪. এই সম্পূর্ণ বিষয়ে রাজ্যকে পূজা অবকাশের ছুটির পর নিয়মিত বেঞ্চে একটি বিশদ রিপোর্ট জমা করতে হবে। ওই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই আদালত পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
আইনি মহლის মতে, গত বছরের জুনে বীরভূমের মুরারইয়ের পাইকর থানার দর্জিপাড়ার বাসিন্দা সোনালী বিবিকে দিল্লি পুলিশ অসম সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার স্মৃতি উসকে দিয়েছে এই কোচবিহারের ঘটনা। দীর্ঘ এক বছরের আইনি লড়াই শেষে সোনালী বিবি দেশে ফিরতে পেরেছিলেন। বর্তমান কোচবিহারের এই মামলাটি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।