ধনতেরাসে কেবল সোনা-রুপো কেনা নয়! সমুদ্রমন্থনের ধন্বন্তরী থেকে যমরাজের চোখ ধাঁধানোর এই অলৌকিক গল্পটি জানেন তো?

ধনতেরাস উৎসব বললেই চোখ ভেসে ওঠে সোনা-রুপোর গয়না, ঝকঝকে নতুন বাসনপত্র কিংবা ব্যবসাই-বাণিজ্যের সমৃদ্ধির ছবিতে। যদিও অনেকেই মনে করেন এটি মূলত অবাঙালি ব্যবসায়ীদের পার্বন, কিন্তু আদতে বাঙালির কোজাগরী ও দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজোর আবহের সঙ্গে ধনতেরাসের এক নিবিড় ও গভীর আধ্যাত্মিক সংযোগ রয়েছে। ধনদেবতা কুবের কিংবা লক্ষ্মী-গণেশ— উভয়ের কৃপা পেতে বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে সকলেই ধনতেরাসের উৎসবে মেতে ওঠেন।
শব্দগত দিক থেকে ‘ধন’ শব্দের অর্থ সম্পত্তি বা সমৃদ্ধি এবং ‘তেরাস’ শব্দের অর্থ কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথি। কার্তিক মাসের এই বিশেষ ১৩ তম দিনে গৃহের সুখ-সমৃদ্ধি ও ধন-সম্পদ কামনায় যে শাস্ত্রীয় রীতি পালিত হয়, তা-ই ধনতেরাস নামে পরিচিত। প্রচলিত বিশ্বাস, এই দিনে ধন-সম্পদের শ্রদ্ধা জানালে এবং সোনা-রুপো কেনাকাটা করলে সংসার থেকে চিরতরে দারিদ্র্য ও অভাব দূর হয়।
সমুদ্রমন্থন ও ধন্বন্তরী ত্রয়োদশীর পুণ্যকথা: পুরাণ মতে, ধনতেরাসের উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবতা ধন্বন্তরীর আবির্ভাবের মহাকাব্যিক গল্প। সমুদ্রমন্থনের সময় এক হাতে সুধারসের (অমৃত) কলস এবং অপর হাতে আয়ুর্বেদের পরম শাস্ত্র নিয়ে উঠে এসেছিলেন ধনের দেবতা ধন্বন্তরী। শাস্ত্রে তাঁকে ধনলক্ষ্মীর সমতুল্য দেবী হিসেবেও গণ্য করা হয়। সেই কারণেই এই তিথিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভরে ‘ধন্বন্তরী ত্রয়োদশী’ বলেও অভিহিত করা হয়। বিশেষ করে ব্যবসায়ী সমাজ এই দিনে ধনকুবের ও ধন্বন্তরীর আরাধনায় ব্রতী হন।
যমরাজের চোখ ধাঁধানো আর যুবরাজের প্রাণরক্ষার অলৌকিক কাহিনি: ধনতেরাসের প্রদীপ জ্বালানো ও সোনা কেনার পেছনে রয়েছে আর এক রোমাঞ্চকর লোকগাথা। কথিত আছে, রাজা হিমুর পুত্রের কোষ্ঠীতে লেখা ছিল— বিয়ের ঠিক চার দিনের মাথায় সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হবে। কিন্তু নবপরিণীতা চতুর রাজবধূ স্বামীর জীবন রক্ষা করতে এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন।
ওই বিশেষ ত্রয়োদশীর রাতে তিনি পুরো ঘর সোনা-রুপোর গয়না ও উজ্জ্বল স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে সাজিয়ে তোলেন এবং চারদিকে শত শত প্রদীপ জ্বালিয়ে দেন। যখন যমরাজ কালসাপের রূপ ধরে যুবরাজের প্রাণ কাড়তে আসেন, তখন সোনা ও প্রদীপের তীব্র আলোয় তাঁর চোখ ধাঁধিয়ে যায়। পরবর্তীতে রাজবধূর মিষ্টি সুরের গান ও গল্পে মুগ্ধ হয়ে সারারাত যমরাজ সেই ঘরেই কাটিয়ে দেন এবং ভোর হতেই যুবরাজকে স্পর্শ না করে শূন্য হাতে যমলোকে ফিরে যান।
এভাবেই অকালমৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান রাজপুত্র। সেই থেকে বিশ্বাস করা হয়, ধনতেরাসের রাতে আলো জ্বালানো এবং ধাতু বা সোনা-রুপো কেনাকাটা করলে সংসারের সমস্ত অশুভ শক্তি ও অকালমৃত্যুর ছায়া কেটে গিয়ে অক্ষয় সমৃদ্ধি বিরাজ করে।