সাত কিলোমিটার পাহাড়ি পথ, কাঁধে অসুস্থ মেয়ে! এক মায়ের এই বুকফাটা লড়াই দেখে কেঁপে উঠবে আপনার বুক!

অন্ধ্রপ্রদেশের বিজয়নগরম জেলা থেকে এমন এক মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে, যা দেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার করুণ ছবিটিকে ফের একবার অত্যন্ত জোরালোভাবে চোখের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের প্রভাবে সৃষ্ট প্রবল বৃষ্টিপাত এবং চরম প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতির মাঝেই কেবল নিজের অসুস্থ বারো বছরের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য এক মা যা করে দেখিয়েছেন, তা শুনলে যে কারোরই রক্ত হিম হয়ে আসবে। দীর্ঘ সাত কিলোমিটারের দুর্গম পাহাড়ি পথ, ভাঙাচোরা কাদা-জল রাস্তা এবং খরস্রোতা জলধারা একা পায়ে হেটে অতিক্রম করেছেন সেই জননী। তাঁর এই অসামান্য ত্যাগের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরই নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল।
ঘটনাটি ঘটেছে বিজয়নগরম জেলার শৃঙ্গবরপুকোটা মণ্ডলের অন্তর্গত অত্যন্ত দুর্গম এক আদিবাসী গ্রাম ‘পাল্লাপু ডুংগাদা’-য়। জানা গিয়েছে, গ্রামের বাসিন্দা বারো বছরের কিশোরী সম্পূর্ণা হঠাৎই মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং শারীরিক দুর্বলতার কারণে সে নিজের পায়ে হাঁটার ক্ষমতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। অথচ সবথেকে বড় বিড়ম্বনার বিষয় হলো, ওই আদিবাসী গ্রামে পৌঁছানোর জন্য কোনো মোটরচালিত রাস্তা বা পাকা সড়ক যোগাযোগের ন্যূনতম সুযোগটুকুও নেই। এর ওপরে সদ্য বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় অর্ণবের তাণ্ডবে গ্রামের চারপাশের কাঁচা রাস্তাঘাট আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মেয়েকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য চরম অসহায় ও দিশাহারা হয়ে পড়েন তার মা জান্নি সুকারাম্মা। কিন্তু হার না মানা এক মায়ের মনের জোর দেখিয়ে তিনি এক মুহূর্তও নষ্ট না করে নিজের অসুস্থ কিশোরী মেয়েকে সোজাসুজি নিজের কাঁধে তুলে নেন।
এক হাতে মেয়ের প্রয়োজনীয় ব্যাগ ও পানীয় জলের বোতল এবং অন্য কাঁধে মুমূর্ষু সন্তান—এই চরম যন্ত্রণাদায়ক অবস্থায় দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরোতে শুরু করেন সুকারাম্মা। টানা সাত কিলোমিটার পথ জঙ্গল, ভাঙাচোরা পাহাড়ি কাদা রাস্তা এবং ছোটখাটো জলস্রোত পেরিয়ে তিনি অবশেষে ডাব্বাগুন্তার কাছাকাছি পাহাড়ের পাদদেশে এসে পৌঁছান। সেখানে আসার পর কোনোমতে একটি অটো জোগাড় করে তিনি মেয়েকে দ্রুত স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান এবং যথাসময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এমনকি হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর মেয়েকে সুস্থ করে তোলার খাতিরে ফের নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বাড়ির দীর্ঘ পথ পাড়ি দেন ওই সাহসী মা।
মায়ের এই বুকফাটা লড়াইয়ের চাঞ্চল্যকর খবরটি দ্রুত মিডিয়ার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই অন্ধ্রপ্রদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে রাজ্যের বিশিষ্ট মন্ত্রী নারা লোকেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ করার ও সার্বিক সহায়তার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি, এই অমানবিক যন্ত্রণার কথা জানতে পেরে রাজ্যসভার সাংসদ বিজয় চিন্তাকায়ালা নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাংসদ তহবিল থেকে ওই প্রত্যন্ত আদিবাসী অঞ্চলের মানুষের জরুরি যাতায়াতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যাম্বুল্যান্স উপহার দেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সাংসদ চিন্তাকায়ালা অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানিয়েছেন, “এটি আমার পক্ষ থেকে একান্তই একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস। ভবিষ্যতে আর যেন কোনো অসহায় মাকে নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে এভাবে অ্যাম্বুল্যান্সের অভাবে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে হাসপাতালে যেতে না হয়।” এক মায়ের এই অদম্য জেদ এবং ভালোবাসার লড়াই যেমন গোটা দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে, তেমনই দেশের প্রত্যন্ত আদিবাসীাঞ্চলগুলির স্বাস্থ্য পরিষেবা ও যাতায়াত ব্যবস্থার বেহাল দশা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।