চাঁদে নয়, এবার পৃথিবীর কক্ষপথে নামবে ভারত! গগনযান মিশনে থাকছে বিশেষ ‘মহাকাশচারী’ রোবট

মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় লেখার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ভারত। সব কিছু পরিকল্পনা মাফিক চললে আগামী ২০২৭ সালেই নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি মহাকাশযানে চেপে মহাশূন্যে পাড়ি দেবেন ভারতীয় মহাকাশচারীরা। ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO)-র বহু প্রতীক্ষিত ‘গগনযান’ (Gaganyaan) প্রকল্প এখন চূড়ান্ত গতিতে এগোচ্ছে। প্রাথমিক দফায় চাঁদে নয়, বরং পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে (Low Earth Orbit) মহাকাশচারীদের পাঠানোই ইসরোর প্রধান লক্ষ্য। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিংহও লোকসভায় এই গুরুত্বপূর্ণ আপডেটটি শেয়ার করেছেন।

তবে মানুষ পাঠানোর আগে চলতি বছরের শেষের দিকেই সম্পন্ন হতে চলেছে বহুল চর্চিত ‘আনম্যানড’ বা মানবহীন অভিযান। এই টেস্ট ফ্লাইটের মাধ্যমে কোনো মানুষ ছাড়াই মহাকাশযানটিকে সুরক্ষিতভাবে লঞ্চ করা এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াটি সফলভাবে পরীক্ষা করে দেখা হবে।

গগনযান প্রকল্প কতটা এগোল?

গগনযান অভিযানের সাফল্য নিশ্চিত করতে একের পর এক জটিল ও স্পর্শকাতর প্রযুক্তির সফল টেস্টিং ইতিমধ্যেই শেষ করেছে ইসরো:

  • শক্তিশালী রকেট ও ক্রু মডিউল: মহাকাশচারীদের বহন করার জন্য বিশেষভাবে পরিবর্তিত HLVM3 রকেটের বারবার পরীক্ষামূলক ট্রায়াল চালানো হয়েছে। প্রস্তুত করা হয়েছে ‘ক্রু মডিউল’ (যেখানে মহাকাশচারীরা অবস্থান করবেন) এবং ‘সার্ভিস মডিউল’।

  • লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম: মহাকাশযানের ভেতরে নিরবিচ্ছিন্ন অক্সিজেন সরবরাহ, সঠিক তাপমাত্রা ও চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কাজ শেষ পর্যায় রয়েছে।

  • জরুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা: কোনো অপ্রীতিকর বা জরুরি পরিস্থিতিতে মহাকাশচারীদের প্রাণরক্ষায় বিশেষ ‘ক্রু এস্কেপ সিস্টেম’ (CES) তৈরি রাখা হয়েছে। এর পাঁচ ধরনের মোটরের পরীক্ষাই সফল হয়েছে।

  • অবতরণ প্রযুক্তি: মহাকাশযান ফেরত আসার সময় অবতরণের গতি নিয়ন্ত্রণ ও প্যারাসুট সিস্টেম খতিয়ে দেখতে দফায় দফায় মহড়া চালানো হয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ TV-D1 পরীক্ষাও শতভাগ সফল হয়েছে।

মহাকাশে আগে যাবে রোবট ‘ব্যোমমিত্র’! কবে যাচ্ছেন মানুষ?

মহাকাশচারীদের পাঠানোর আগে ইসরো সম্পূর্ণ মানবহীন অভিযানের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে প্রথম মানবহীন ফ্লাইটে মানুষের পরিবর্তে পাঠানো হবে ইসরোর নিজস্ব তৈরি বিশেষ হিউম্যানয়েড রোবট ‘ব্যোমমিত্র’ (Vyommitra)। চলতি বছরের শেষেই শুরু হবে এই ঐতিহাসিক ট্রায়াল।

এর পর আরও দু’টি পর্যায়ক্রমিক মানবহীন মহাকাশ অভিযান চালানো হবে। এই সমস্ত প্রাথমিক পরীক্ষা সফল হলে, ২০২৭ সালেই ভারতের মাটি থেকে প্রথমবার মহাকাশচারীরা মহাশূন্যে পা রাখবেন। উল্লেখ্য, এই অভিযানের জন্য মনোনীত ভারতীয় অ্যাস্ট্রোনটরা ইতিমধ্যেই রাশিয়ায় তাঁদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন এবং বর্তমানে বেঙ্গালুরুতে ইসরোর বিশেষ সেন্টারে কঠোর অ্যাডভান্সড ট্রেনিং নিচ্ছেন।

পরবর্তী মেগা টার্গেট: ভারতের নিজস্ব স্পেস স্টেশন

গগনযান মিশন ভারতের মহাকাশ গবেষণার কেবল সূচনা মাত্র। ভারতের আসল লক্ষ্য আরও বড়। কেন্দ্রীয় সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাশূন্যে ‘ভারতীয় অন্তরীক্ষ স্টেশন’ (Bharatiya Antariksh Station) গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

মোট পাঁচটি পৃথক মডিউল নিয়ে এই পূর্ণাঙ্গ স্পেস স্টেশনটি তৈরি করা হবে, যার প্রথম মডিউলটি তৈরির জন্য ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছে। পুরো গগনযান ও সম্পর্কিত গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা ২০,১৯৩ কোটি টাকার বিপুল অর্থ অনুমোদন করেছে। তবে এই মুহূর্তে ইসরো বিজ্ঞানীদের মূল অগ্রাধিকার ও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ২০২৭ সালের গগনযান মিশনকে নিখুঁতভাবে সফল করে তোলা।