ওমর আবদুল্লার সিংহাসনে বড় ধস! ন্যাশনাল কনফারেন্সের ১৮ বিধায়কের বিদ্রোহে কি জম্মু ও কাশ্মীরে আসছে বিজেপি সরকার?

জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনৈতিক ময়দানে নতুন করে এক প্রবল তোলপাড় শুরু হয়েছে। শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (NC) অভ্যন্তরীণ অন্দরে দীর্ঘদিনের চাপা অসন্তোষ এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। দলের প্রায় ১৮ জন বিধায়ক সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের কার্যকলাপে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। বিদ্রোহী এই বিধায়কদের প্রধান অভিযোগ, দলের ভেতরে ক্রমেই একচ্ছত্র গোষ্ঠীতন্ত্র জেঁকে বসেছে, সমস্ত সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নেওয়া হচ্ছে এবং আসন্ন বা সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ নেতাদের চরমভাবে অবহেলা করা হয়েছে। বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণ ও হিসাব-নিকাশ ঘিরে ইতিমধ্যেই জোরালো জল্পনা শুরু হয়েছে যে, এই বিদ্রোহী বিধায়করা যদি শেষ পর্যন্ত দলত্যাগ করে ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) সঙ্গে হাত মেলান, তবে জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের চূড়ান্ত পথ খুলে যেতে পারে।
বিধানসভার মোট আসন সংখ্যা ৯৫টি হলেও বর্তমানে মনোনীত পাঁচটি আসন খালি থাকায় কার্যকর শক্তি রয়েছে ৯০টিতে। এখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য ম্যাজিক ফিগার হলো ৪৬ জন বিধায়কের সমর্থন। বর্তমানে বিরোধী দল বিজেপির নিজস্ব ঝুলিতে রয়েছে ২৯টি আসন। এই পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল কনফারেন্সের ১৮ জন বিদ্রোহী বিধায়ক যদি বর্তমান সরকারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে বিজেপির পাশে এসে দাঁড়ান, তবে জোটের মোট সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৪৭-এ, যা স্পষ্টতই সংখ্যাগরিষ্ঠতার গণ্ডি পার করে দেয়। রাজনৈতিক মহলে এই গাণিতিক হিসাবই এখন সবথেকে বড় চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি নতুন করে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পরেই এই অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে আসে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ যখন চারজন নতুন মন্ত্রীকে শপথবাক্য পাঠ করান, ঠিক তখনই দলের বহু অভিজ্ঞ ও সিনিয়র বিধায়ক মন্ত্রিত্ব থেকে বাদ পড়েন। তাঁদের অনেকেরই জোরালো দাবি, এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো রকম গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেওয়া হয়নি। বরং দলের অন্দরে একটি নির্দিষ্ট ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর প্রভাব অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই ক্ষোভের জেরে সম্প্রতি শ্রীনগরের এক গোপন বৈঠকে প্রায় ১৮ জন বিধায়ক একত্রিত হয়ে রণকৌশল স্থির করেন। তাঁরা দলীয় নেতৃত্বের কাছে ১৪ থেকে ১৫ দিনের একটি কড়া আলটিমেটামও দিয়েছেন। তাঁদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে মন্ত্রিসভার আমূল রদবদল, বিতর্কিত উপদেষ্টাদের অবিলম্বে অপসারণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে দেওয়া দলীয় প্রতিশ্রুতিগুলি পূরণের জন্য একটি স্বচ্ছ রোডম্যাপ তৈরি করা।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল কনফারেন্সের মোট বিধায়ক সংখ্যা প্রায় ৪১ থেকে ৪২। বর্তমানে কংগ্রেস এবং অন্যান্য ছোট দলগুলির সমর্থনে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাদের হাতে রয়েছে। কিন্তু যদি ১৮ বা তার বেশি সংখ্যক বিধায়ক দল থেকে একযোগে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন, তবে স্বাভাবিকভাবেই ওমর সরকারের ভিত প্রচণ্ড নড়বড়ে হয়ে পড়বে। আর ঠিক এই সুযোগটিকেই পুরোপুরি কাজে লাগাতে চাইছে বিরোধী দল বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই দাবি করা হচ্ছে যে, শাসক দলের অন্দরের এই মারাত্মক অস্থিরতাই প্রমাণ করে দেয় যে বর্তমান সরকার সাধারণ জনগণের ন্যূনতম আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
তবে এই সংকটের আবহেও ন্যাশনাল কনফারেন্সের শীর্ষ নেতৃত্ব বিষয়টিকে সরাসরি দল ভাঙন বা বিদ্রোহ বলতে নারাজ। বরং তাঁরা একে দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই দাবি করছেন। দলের প্রবীণ নেতাদের বক্তব্য, কিছু নির্বাচিত বিধায়কের ক্ষোভ থাকতেই পারে, কিন্তু দল ভাঙার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কারো নেই। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং দলের হেভিওয়েট নেতা ফারুক আবদুল্লাহর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে খুব শীঘ্রই এই অভ্যন্তরীণ সমস্যার সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান হবে বলেই তাঁরা আশাবাদী।
এই রাজনৈতিক সংকটের পটভূমিতে আরও একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। শ্রীনগরের প্রভাবশালী সাংসদ আগা সৈয়দ রুহুল্লাহ দল এবং সংসদ থেকে হঠাৎই পদত্যাগের ঘোষণা করেছেন। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, দল তাদের মূল আদর্শিক প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়েছে। এই পদত্যাগের ঘটনা এনসি শিবিরের অন্দরে অস্থিরতাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হওয়ার কারণে এখানে ক্ষমতার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রয়েছে, এবং রাজ্যের পূর্ণ মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দাবি এখনও উপত্যকা জুড়ে অত্যন্ত জোরালো। এমন একটি স্পর্শকাতর মুহূর্তে দলীয় বিদ্রোহ যদি সত্যিই সংখ্যাতত্ত্বের সমীকরণ বদলে দেয়, তবে জম্মু ও কাশ্মীরের ক্ষমতার ভারসাম্য চিরতরে বদলে যেতে পারে। তবে এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিদ্রোহী বিধায়করা আলটিমেটামের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই শীর্ষ নেতৃত্বের ইতিবাচক সাড়ার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।