১৪ মাস জেলে, তবু হয়নি একবারও পেশ! বিহার পুলিশের এই চরম গাফিলতিতে সুপ্রিম কোর্টে যা ঘটল, জানলে চমকে উঠবেন!

দেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক তৎপরতা নিয়ে ফের একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে গেল। দীর্ঘ প্রায় ১৪ মাস ধরে টানা কারাগারে বন্দি থাকার পরেও বিচারাধীন কোনো অভিযুক্তকে একবারের জন্যও আদালতে সশরীরে হাজির করা হয়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ঝুলে থাকা মামলার কোনো চার্জ বা অভিযোগ পর্যন্ত গঠন করা সম্ভব হয়নি। বিহারের গয়া জেলা থেকে উঠে আসা এই চাঞ্চল্যকর ও নজিরবিহীন ঘটনায় চরম বিস্ময় ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত এবং বিচারপতি শিল নাগুর ডিভিশন বেঞ্চ। কেন এবং কী কারণে টানা চোদ্দো মাস ধরে অভিযুক্তকে গয়া আদালতে পেশ করা হলো না, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে সরাসরি বিহার পুলিশ প্রশাসনের কাছে কঠোর রিপোর্ট তলব করেছে দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে গোটা ঘটনাটিকে অত্যন্ত ‘অনভিপ্রেত’ আখ্যা দিয়ে বিহার পুলিশ এবং গয়া বিচারবিভাগীয় আদালতের কাছে জবাব চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম দেব কুমার পাসওয়ান। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ইউএপিএ (UAPA) অর্থাৎ কঠোর বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন, ভারতীয় দণ্ডবিধি (IPC), অস্ত্র আইন এবং বিস্ফোরক পদার্থ আইনের একাধিক ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে। পুলিশি সূত্রের খবর, ২০১৮ সালে গয়ার ডুমারিয়া থানায় এই মামলাটি দায়ের করা হয়েছিল। পুলিশের দাবি, ধৃত দেব কুমার নিষিদ্ধ কোনো মাওবাদী সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। পাটনা হাইকোর্ট তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় তিনি আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন।
শীর্ষ আদালতে মামলাটির শুনানি চলাকালীন অভিযুক্তের আইনজীবী আদালতকে এক বিস্ফোরক তথ্য জানান। তিনি জানান যে, বিহার সরকারের তরফে দাখিল করা নিজস্ব হলফনামাতেই স্বীকার করা হয়েছে যে, অভিযুক্তকে ট্রায়াল কোর্টে সশরীরে হাজির করা সম্ভব না হওয়ার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ে চার্জ গঠন করা যায়নি। অর্থাৎ, পুলিশি ব্যর্থতার জেরে মামলার বিচারপ্রক্রিয়া পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে রয়েছে। এই সওয়াল শুনে বেঞ্চের বিচারপতিরা রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। আদালতের কড়া পর্যবেক্ষণ ছিল, ২০২৫ সালের ১০ মে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে আদালতে আত্মসমর্পণ করা সত্ত্বেও কেন টানা চৌদ্দো মাস তাঁকে বিচারিক আদালতের মুখোমুখি করা হলো না, তা বোধগম্যের বাইরে। সুপ্রিম কোর্টের এই কঠিন প্রশ্নের সামনে কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি বিহার সরকারের পক্ষে উপস্থিত আইনজীবী। এমনকি গয়া আদালত কেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অভিযুক্তকে হাজির করার কঠোর নির্দেশ দিল না, তা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছে সর্বোচ্চ আদালত।
এই পরিস্থিতিতে ঘটনার প্রকৃত কারণ খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী আধিকারিককে একটি পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পাটনা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তিনি সংশ্লিষ্ট গয়া আদালতের কাছ থেকে সমস্ত তথ্য সংগ্রহ করে একটি সিলমোহর করা খামে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে তা জমা দেন। এদিকে শুনানির সময় আদালতের নজরে আসে যে, এই একই মামলার অন্যান্য মূল অভিযুক্তরা ইতিপূর্বেই আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পেয়ে গিয়েছেন। এই তথ্য সামনে আসার পরেই আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মামলাটি ধৃত দেব কুমারের পক্ষেই রয়েছে। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করে শীর্ষ আদালত তাঁকে অবিলম্বে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ১৭ নভেম্বর এই চাঞ্চল্যকর মামলার পরবর্তী শুনানি ধার্য করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে।