টেনশন কি কেড়ে নিচ্ছে পিতৃত্ব-মাতৃত্বের সুখ? অবহেলা করলেই বড় বিপদ, জানুন চাঞ্চল্যকর তথ্য!

মাসিক চক্র দশ দিন দেরিতে শুরু হওয়া, কাজের চাপে ক্লান্ত থাকায় দম্পতিদের বারবার শারীরিক ঘনিষ্ঠতা এড়িয়ে যাওয়া, কিংবা মাসের পর মাস গর্ভাবস্থা পরীক্ষার ফলাফল নেগেটিভ আসা—এই সমস্যাগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে আলাদা মনে হতে পারে। তবে চিকিৎসকদের মতে, এই সবকিছুর নেপথ্যে রয়েছে একটাই নীরব শত্রু—দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা স্ট্রেস।
বিশের কোঠার শেষ দিকে বা ত্রিশের কোঠায় থাকা বহু মানুষের জীবন এখন এক অবিরাম ভারসাম্য রক্ষার লড়াই। ডেডলাইন, দীর্ঘ যাতায়াত, আর্থিক দুশ্চিন্তা এবং পরিবারের প্রত্যাশা মেটানোর ইঁদুরদৌড়ে ঘুমের সময় কমেছে, অনিয়মিত হয়েছে খাওয়াদাওয়া। অধিকাংশ মানুষই একে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিলেও শরীর কিন্তু বিষয়টি সহজভাবে নিচ্ছে না। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নারী ও পুরুষ উভয়েরই প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
নারীদের প্রজনন চক্রে মানসিক চাপের থাবা
অনেক নারীই প্রথমত লক্ষ্য করেন যে তাঁদের মাসিক চক্র আর আগের মতো নিয়মিত বা অনুমানযোগ্য নেই। কখনো মাসিক দীর্ঘায়িত হয়, কখনো পুরোপুরি বন্ধ থাকে, আবার কখনো প্রি-মেনস্ট্রুয়াল উপসর্গগুলো সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
এর পেছনে রয়েছে বিজ্ঞানসম্মত কারণ। শরীর যখন দীর্ঘমেয়াদি চাপের মধ্যে থাকে, তখন কর্টিসলের মতো হরমোন নিঃসরিত হয়। এই হরমোনগুলো মস্তিষ্ক ও ডিম্বাশয়ের মধ্যকার হরমোনের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করে। ফলে ডিম্বস্ফোটন বা ওভুলেশন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। তবে চিকিৎসকদের পরামর্শ, মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পেছনে সবসময় শুধু মানসিক চাপ নয়, পিসিওএস (PCOS) বা থাইরয়েডের মতো সমস্যাও দায়ী থাকতে পারে, তাই সঠিক রোগ নির্ণয় জরুরি।
পুরুষদের ক্ষেত্রেও মারাত্মক প্রভাব
প্রজনন ক্ষমতা নিয়ে আলোচনার সময় সাধারণত নারীদের কথাই বেশি ভাবা হয়। কিন্তু মানসিক চাপ কেবল একজনের ওপর প্রভাব ফেলে না। গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ টেস্টোস্টেরনের মাত্রা, যৌন আকাঙ্ক্ষা এবং লিঙ্গোত্থান ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জেবিআরএ অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন (JBRA Assisted Reproduction) জার্নালে প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় ১১ হাজারের বেশি পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মানসিক চাপে থাকা পুরুষদের মধ্যে ৫২.৯ শতাংশের শুক্রাণুর ঘনত্ব এবং ৬৩.৩ শতাংশের শুক্রাণুর গতিশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
সন্তান নেওয়ার চাপ এবং জটিলতা
যেসব দম্পতি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের ওপর অপ্রত্যাশিত মানসিক চাপ তৈরি হয়। গর্ভধারণে দেরি হলে সেই প্রচেষ্টা নিজেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফার্টাইল দিন হিসাব করা বা চিকিৎসকের কাছে ছোট ছোট বিষয়ের জন্য ছোটার ফলে সম্পর্কের অন্তরঙ্গতাও অনেক সময় যান্ত্রিক হয়ে পড়ে।
অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বজুড়ে প্রতি ছ’জন প্রাপ্তবয়স্কের প্রজনন সংক্রান্ত সমস্যার সম্মুখীন হন। এর পেছনে বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর স্বাস্থ্য কিংবা অন্যান্য শারীরিক জটিলতাও জড়িত। দৈনন্দিন জীবন থেকে মানসিক চাপ সম্পূর্ণ দূর করা সম্ভব না হলেও, পর্যাপ্ত ঘুম (৭-৮ ঘণ্টা), সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং যোগব্যায়াম বা পছন্দের কাজের মাধ্যমে স্ট্রেস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।