কালীপুজোর আলোর রোশনাইয়ের মাঝেই সোনামুখীর ‘হানাবাড়ি’র গোপন রহস্য ফাঁস! কার এই বিশাল প্রাসাদ?

কালী ও কার্তিকের শহর হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত বাঁকুড়ার সোনামুখী। দীপাবলির এই আনন্দমুখর সময়ে আলোর রোশনাই আর দেবীর আরাধনায় মেতে ওঠেন হাজার হাজার মানুষ। তবে পুজোর এই বর্ণাঢ্য উৎসব এবং ঐতিহ্যের পাশাপাশি সোনামুখীর বুকে আজও বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক বিস্মৃত ও রোমাঞ্চকর ইতিহাস। শহরের প্রবেশদ্বারেই বাঁ দিকে তাকালে চোখে পড়বে একটি বিশাল প্রাচীন ও ভগ্নপ্রায় বাড়ি। স্থানীয় মানুষের একাংশের কাছে এটি ‘হানাবাড়ি’ হিসেবে পরিচিত, আবার কেউ কেউ একে ব্রিটিশ আমলের এক পুরোনো ‘নীলকুঠি’ বলেও মনে করেন। নানা লোককথা আর ভৌতিক গুঞ্জনে মোড়া এই বাড়িটি ঘিরে রয়েছে বাংলার বাণিজ্যনগরী সোনামুখীর এক সুপ্রাচীন ও সোনালী ইতিহাস।

স্থানীয় ইতিহাস ও গবেষকদের মতে, এই প্রাচীন বাড়ির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এককালের ব্রিটিশ চিকিৎসক তথা প্রশাসক ডক্টর জে এন চিক বা ‘চিক সাহেবের’ নাম। পেশায় চিকিৎসক হলেও তাঁর মূল ঝোঁক ছিল ব্যবসা ও বাণিজ্যের দিকে। ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ দায়িত্বে থাকার সুবাদে সোনামুখী, বাঁকুড়া এবং বর্ধমান অঞ্চলের সঙ্গে তাঁর নিবিড় বাণিজ্যিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। সেই সময়ে সোনামুখীতে রেশমশিল্প, গালা এবং নীলচাষের অপার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি। সেই ব্যবসাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যেই তিনি এই অঞ্চলে বিশাল বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। সময়ের বিবর্তনে স্থানীয় মানুষের মুখে চিক সাহেবের নাম অপভ্রংশ হয়ে ‘চিফ সাহেব’ হিসেবেও প্রচলিত হয়েছে।

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে জানা যায়, সোনামুখীকে কেন্দ্র করে রেশম, গালা ও নীলের ব্যবসা থেকে বিপুল পরিমাণ মুনাফা অর্জন করেছিলেন এই ব্রিটিশ চিকিৎসক। ব্যবসার পরিধি এতটাই বিস্তৃত হয়েছিল যে কালক্রমে ইলামবাজার অঞ্চলেও সেই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে এই রমরমা ব্যবসার আড়ালে রয়েছে ঔপনিবেশিক শোষণ, নিপীড়ন এবং স্থানীয় কৃষকদের বঞ্চনার এক করুণ ও অন্ধকার অধ্যায়। তাই সোনামুখী প্রবেশদ্বারের এই প্রাচীন বিশাল স্থাপত্যটি কেবল একটি সাধারণ পুরোনো ইমারত নয়, বরং এটি বাংলার ঔপনিবেশিক অতীত, রমরমা বাণিজ্য এবং ব্রিটিশ শোষণের এক নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাঁকুড়া থেকে বেলিয়াতোড় ও পাত্রসায়েরের রাস্তা ধরে সোনামুখীতে প্রবেশ করলেই বাইরে থেকে এর বিশালতা অতীতের জৌলুস স্মরণ করায়। চলতি কালীপুজোয় সোনামুখী ভ্রমণের পরিকল্পনা করলে প্রাচীন মন্দিরগুলির পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঘুরে দেখার অভিজ্ঞতা আপনার রোমাঞ্চ দ্বিগুণ করে দেবে।