উত্তম কুমারকে দিয়ে মান্না দে-র গান! বাংলা সঙ্গীতের কিংবদন্তি সুধীন দাশগুপ্তকে নিয়ে শহরে কোন মেগা ইভেন্ট?

বাংলা গানের স্বত্ব ও সুরের জগতে এমন কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ রয়েছেন, যাঁদের সৃষ্টি অমর হয়ে থাকে কালের সীমানা ছাড়িয়ে। এই কিংবদন্তিদের তালিকায় প্রথম সারিতেই নাম আসে কালজয়ী সুরকার ও গীতিকার সুধীন দাশগুপ্তের। কখনও তাঁর জাদুকরী সুরে মেতে উঠেছে বাংলা চলচ্চিত্র, আবার কখনও তাঁর লেখা কালজয়ী পঙক্তিগুলি চিরকালের মতো জায়গা করে নিয়েছে কোটি কোটি শ্রোতার মনের মণিকোঠায়। ‘হয়তো তোমারই জন্য’-র মতো মাস্টারপিস থেকে শুরু করে বাংলা সিনেমার সোনাঝরা সব সুর—তাঁর সুরের বৈচিত্র্য আজও সমানভাবে সম্মোহিত করে আধুনিক সঙ্গীতপ্রেমীদের। সেই প্রতিভাবান সুরকারকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেই আগামী ৭ নভেম্বর, শনিবার কলকাতার সুপ্রসিদ্ধ কলামন্দির প্রেক্ষাগৃহে আয়োজিত হতে চলেছে এক বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান—‘এত সুর আর এত গান’। কিংবদন্তির ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এক বিশিষ্ট সংস্থার উদ্যোগে এই জমজমাট আসর বসছে।

বাংলা আধুনিক গান এবং চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগে সুধীন দাশগুপ্তের অবদান অনন্য ও অতুলনীয়। সুরের জাদুকর হওয়ার পাশাপাশি দক্ষ গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিতে মিশে থাকত আধুনিকতার ছোঁয়া, গভীর কাব্যিক অনুভূতি এবং এক স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত সুরের মাধুর্য। বাংলা চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক। মহানায়ক উত্তম কুমারের ঠোঁটে মান্না দে-কে দিয়ে প্রথম গান গাওয়ানোর কৃতিত্ব যেমন তাঁর ঝুলিতে রয়েছে, তেমনই বাংলা চলচ্চিত্রে অমিত কুমারের মতো প্রতিভাকে নিয়ে আসার পেছনেও ছিল তাঁর অসামান্য দূরদর্শিতা। শুধু সিনেমা বা আধুনিক গানই নয়, বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় জিঙ্গল তৈরিতেও তিনি রেখেছিলেন প্রতিভার অনন্য স্বাক্ষর। চলচ্চিত্র থেকে বিজ্ঞাপনের জগত—সর্বত্রই তাঁর মুন্সিয়ানা স্পষ্ট ছিল।

প্রয়াত এই সুরকার-গীতিকারের জীবন ও কর্মের নানা অজানা অধ্যায় দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে এই বিশেষ সন্ধ্যার পরিকল্পনা করেছেন তাঁরই সুযোগ্য পুত্র সৌম্য দাশগুপ্ত। তাঁর সুচিন্তিত ভাবনায় এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই দর্শক-শ্রোতারা নতুন করে ফিরে দেখতে চলেছেন সুধীন দাশগুপ্তের সৃষ্টির বিস্তৃত ও বর্ণাঢ্য জগত। স্মৃতির ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে উঠবে ‘মিস ক্যালকাটা’-র সুরের জাদু, ‘বসন্ত বিলাপ’-এর মেসবাড়ির আড্ডার মজার গান কিংবা ‘তিন ভুবনের পারে’ ও ‘ছদ্মবেশী’-র মতো অবিস্মরণীয় ছবির চলচ্চিত্রের মোহিত করা সব সৃষ্টি। পরিচিত ও জনপ্রিয় সুরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া নানা অজানা সৃষ্টিকেও নতুন করে আবিষ্কার করার দারুণ সুযোগ পাবেন উপস্থিত দর্শকরা।

বাবাকে নিয়ে এই আয়োজন প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সৌম্য দাশগুপ্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, বাবার অমিয় সৃষ্টি ও গান নিয়ে এমন একটি চমৎকার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়ায় তাঁর ভীষণ ভালো লাগছে। সুরকার পরিচয়ের পাশাপাশি সুধীনবাবু যে একজন অসাধারণ গীতিকার ছিলেন, তা এদিনের মঞ্চে বিশেষভাবে উদযাপন করা হবে। এই স্মরণীয় সঙ্গীতসন্ধ্যায় সুরের আলো ছড়াতে মঞ্চ কাঁপাবেন শ্রীকান্ত আচার্য, শ্রীরাধা বন্দ্যোপাধ্যায়, রূপঙ্কর বাগচী, জয়তী চক্রবর্তী, অরিত্র দাশগুপ্ত, দীপান্বিতা চৌধুরী, বিশাখ জ্যোতি মজুমদার এবং শিলাদিত্য চক্রবর্তীর মতো একঝাঁক প্রথিতযশা শিল্পী। গোটা অনুষ্ঠানটির নান্দনিক সঙ্গীতায়োজনের দায়িত্বে রয়েছেন প্রতিভাবান শোভন মুখোপাধ্যায়। এছাড়া এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করবেন রামানুজ দাশগুপ্ত ও সুজাতা সরকার এবং বিশেষ আলাপচারিতায় অংশ নেবেন ঝর্ণা ভট্টাচার্য। সব মিলিয়ে, ‘এত সুর আর এত গান’ নিছক কোনো কনসার্ট নয়, বরং বাংলা গানের এক সোনালী যুগের মহাতারকার প্রতি সার্থক শ্রদ্ধার্ঘ্য।