ল্যাবে ভাঙল প্লেগের টেস্ট টিউব, গবেষকের মর্মান্তিক মৃত্যু! করোনা-ভীতি কাটার আগেই ফের নতুন মহামারীর আশঙ্কা?

বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারীর বিভীষিকা কাটার আগেই এবার নতুন এক প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধির আতঙ্কে কাঁপছে বিশ্ব। রাশিয়ার সাইবেরিয়ার একটি অতিসংবেদনশীল গবেষণা কেন্দ্রে প্লেগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে এক ২৮ বছর বয়সী তরুণ ল্যাব টেকনিশিয়ানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। সোভিয়েত আমলের ঐতিহাসিক সেই গবেষণাগারে টেস্ট টিউব ভেঙে প্লেগের জীবাণু ছড়ানোর তথ্য সামনে আসতেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে নতুন এক মহামারী বা ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর পুনরাবৃত্তির আতঙ্ক।

কী ঘটেছিল সাইবেরিয়ার ল্যাবে?

ঘটনাটি ঘটেছে সাইবেরিয়ার ইরকুটস্ক অঞ্চলের ‘ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউট অফ সাইবেরিয়া অ্যান্ড দ্য ফার ইস্ট’-এ। ১৯৩৪ সালে সোভিয়েত যুগে প্রতিষ্ঠিত এই গবেষণাগারটিতে প্লেগ, কলেরা ও অ্যানথ্রাক্সের মতো অত্যন্ত বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে গবেষণা চলে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ল্যাবে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী এক কর্মী হঠাৎই ‘অজ্ঞাত কারণের’ নিউমোনিয়া ও তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হন। চিকিৎসকদের তিনি নিজেই জানান যে, গবেষণাগারে কাজ করার সময় প্লেগ জীবাণুবাহী একটি টেস্ট টিউব অসাবধানতাবশত ভেঙে গিয়েছিল। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। ঘটনার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে স্থানীয় প্রশাসন শেলেখভ সিটি হাসপাতালকে সম্পূর্ণ কোয়ারেন্টাইন করেছে এবং প্রায় ২০০ জনকে জরুরি চিকিৎসার পর্যবেক্ষণে রেখেছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে ইরকুটস্কের গভর্নর ইগর কোবজেভ ওই অঞ্চলে সব ধরনের জনসমাগম বাতিল করেছেন।

উদ্বেগে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)

পুরো বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার রহস্যজনক ভূমিকায় চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ডব্লিউএইচও প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস জানিয়েছেন, “এই মারাত্মক ঘটনা সম্পর্কে রাশিয়া আমাদের কাছে এখনও কোনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেয়নি।” অন্যদিকে, সংস্থার মহামারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারিয়া ভ্যান কারখোভ স্পষ্ট জানান, ল্যাব কর্মী ঠিক কীভাবে সংক্রমিত হলেন এবং দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি এতে আক্রান্ত কি না—সে বিষয়ে রাশিয়ার অবিলম্বে স্বচ্ছ তথ্য দেওয়া উচিত।

প্লেগ কতটা বিপজ্জনক ও প্রতিকার কী?

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লেগ হলো ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস (Yersinia pestis) নামক প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার কারণে সৃষ্ট একটি রোগ। এর প্রধান তিনটি রূপ রয়েছে—বুবোনিক, সেপটিসেমিক এবং সবচেয়ে মারাত্মক ‘নিউমোনিক প্লেগ’। নিউমোনিক প্লেগ সরাসরি মানুষের ফুসফুসকে আক্রমণ করে এবং বাতাস বা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়াতে পারে।

তবে স্বস্তির কথা হলো, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে প্লেগের কার্যকরী প্রতিকার রয়েছে। জেন্টামাইসিন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন, স্ট্রেপ্টোমাইসিন এবং মক্সিফ্লক্সাসিনের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবহার করলে রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। চিকিৎসায় দেরি হলেই এটি মারণ রূপ ধারণ করে।

তবে কি আবার বড় মহামারীর আশঙ্কা?

এই ঘটনা কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক তৈরি হলেও আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি “কম” বলেই জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)। রাশিয়ার স্বাস্থ্য সংস্থা ‘রস্পোট্রেবনাদজর’ দাবি করেছে, মানুষের জন্য বড় কোনো মহামারীজনিত সতর্কতা নেই এবং প্রায় ৫,০০০ ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে কোনো বিপজ্জনক জীবাণু মেলেনি।

ইতিহাসের সেই প্রাচীন ‘ব্ল্যাক ডেথ’ বা প্লেগ অ্যান্টিবায়োটিকের যুগে আর ততটা অমোগাথ নয়। মাদাগাস্কার, কঙ্গো ও পেরুর মতো দেশে প্রতি বছর শত শত মানুষ প্লেগে আক্রান্ত হলেও আধুনিক চিকিৎসায় তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে। তবে ল্যাবরেটরির মতো অত্যন্ত সুরক্ষিত স্থান থেকে প্লেগের মতো বিপজ্জনক জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।