“১০ নম্বর জার্সিতে শেষ ম্যাসিক”-বিদায় বেলায় হাউহাউ করে কাঁদলেন মেসি!

ফুটবল বিশ্বে জাদুকরদের আবির্ভাব হয় কালের নিয়মেই। তারপর একদিন তাঁদের বুটজোড়া তুলে রাখার সময় আসে, আর বিশ্ব তাকিয়ে থাকে নতুন কোনো জাদুকরের প্রত্যাশায়। দিয়েগো মারাদোনার পর বিশ্ব ফুটবলের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল এক অবিসংবাদিত বরপুত্রকে—লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। ভালোবেসে যাঁকে বিশ্ববাসী ডাকে ‘LM10’। এবার সত্যি সত্যিই সেই রূপকথার মহাকাব্যিক শেষ অঙ্কটি লেখা হয়ে গেল। মঙ্গলবার রাতে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে এক আবেগঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে রাজকীয় বিদায় জানালেন এই ফুটবল জাদুকর।
কান্নায় ভাসল বুয়েনস আইরেস, পাশে প্রাক্তন সতীর্থ ও পরিবার
বেঙ্কিন Faso নয়, বেনিনের বিরুদ্ধে এই বিশেষ ফেয়ারওয়েল ম্যাচটি খেলতে নেমেছিল আর্জেন্টিনা। প্রিয় অধিনায়কের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে উপচে পড়েছিল নীল-সাদা সমর্থকের ঢল। গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন কোপা আমেরিকার পর বিদায় নেওয়া মেসির দীর্ঘদিনের সতীর্থ অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া এবং ফরাসি কিংবদন্তি ডেভিড ত্রেজেগের মতো তারকারা।
জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর সময় নিজের তিন ছেলে—থিয়াগো, মাতেও এবং চিরোকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামেন মেসি। আতশবাজির আলো এবং গ্যালারির গর্জনের মাঝে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার সময় আর চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কোচ লিওনেল স্কালোনি ও সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দির চোখও তখন ভিজছিল আবেগে। ম্যাচের টসের আগে বেনিনের অধিনায়ক মেসির হাতে তুলে দেন একটি বিশেষ স্মারক ও চিঠি।
মাঠে নেমে সেই চেনা ম্যাজিক ও শেষ গোল
বিদায়ী ম্যাচ হলেও কোনো আলস্য ছিল না মেসির খেলায়। সপ্তম মিনিটে বক্সের বাইরে দ্রুত ওয়ান-টু পাস খেলে প্রথম অন-টার্গেট শট নেন তিনি। ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় সমগ্র স্টেডিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে তালি দিয়ে শ্রদ্ধা জানায় এই বিশ্ববরেণ্য ১০ নম্বরকে। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে ঘুরে দাঁড়ায় আলবিসেলেস্তারা।
ওতামেন্দির বিদায়ী অবদান: দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই মেসির বাড়ানো নিখুঁত ক্রস থেকে চমৎকার গোল করেন নিকোলাস ওতামেন্দি। জাতীয় দলের হয়ে এটিই ছিল ওতামেন্দিরও শেষ ম্যাচ।
ভবিষ্যতের উত্তরসূরি: এরপর নিকো পাজ এক দুর্দান্ত বাঁকানো শটে দলের ব্যবধান ২-০ করেন। যাকে অনেকেই মেসির ১০ নম্বর জার্সির যোগ্য উত্তরসূরি বলে মনে করছেন।
স্বপ্নের বিদায়ী গোল: ম্যাচের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত মুহূর্তটি আসে ৬৯ মিনিটে। পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। স্পট থেকে নিজের চেনা জাদুতে বল জালে জড়িয়ে দেন মেসি (৩-০)। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে শেষ গোলটি পেয়ে সতীর্থদের সঙ্গে উল্লাসে মেতে ওঠেন অধিনায়ক।
একটি যুগের সমাপ্তি
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার ঠিক আগে ২১ মিটার দূর থেকে একটি ফ্রি-কিক পেয়েছিলেন মেসি। গোটা স্টেডিয়াম তখন মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে অপেক্ষায় ছিল শেষ এক জাদুকরী শটের। যদিও সেই শট গোলপোস্টের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবে তাতে জাদুকরের মহিমায় কোনো ভাটা পড়েনি।
অবশেষে বেজে ওঠে শেষ বাঁশি। আতশবাজির রোশনাই, অশ্রুসিক্ত গ্যালারি এবং ‘মেসি-মেসি’ গর্জনে ভারী হয়ে ওঠে মনুমেন্টালের আকাশ। দেশের জার্সিতে টানা প্রায় দুই দশক বিশ্বকে বুন্দ করে রাখা ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি শেষবারের মতো মাঠ ছাড়লেন—রেখে গেলেন এক অমলিন, রূপকথার মতো ইতিহাস।