জালিয়াতির নতুন মাস্টারপ্ল্যান! ১৯৯ কোটির টার্ম লোন নিয়ে খেলা ঘোরাল সংস্থা, কাঠগড়ায় আসামীরা

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা তছরুপের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। হंজর গ্রুপ এবং তার একাধিক সহযোগী কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায় ৯৩.৪৪ কোটি টাকার জালিয়াতি ও আর্থিক তছরুপের অভিযোগে এফআইআর দায়ের করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই (CBI)। ব্যাংক ও ফরেনসিক অডিট রিপোর্টের চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ ও ২০১০ সালে বিভিন্ন প্রকল্পের কথা বলে একাধিক ব্যাঙ্ক থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার টার্ম লোন মঞ্জুর করিয়েছিল অভিযুক্ত কোম্পানি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঋণ পরিশোধ না করায় এবং তহবিলের অপব্যবহারের জেরে সেই অ্যাকাউন্টটি এনপিএ (NPA) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, ২০১১ সাল থেকেই হंজর গ্রুপের অ্যাকাউন্টগুলোতে ব্যাপক অনিয়ম শুরু হয়েছিল। ব্যাঙ্ক থেকে বারবার নোটিশ ও যোগাযোগ করা সত্ত্বেও বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এরপর তদন্তের স্বার্থে বিডিও (BDO India LLP)-কে দিয়ে ফরেনসিক অডিট করানো হলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। অডিট রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্ল্যান্ট ও মেশিনারি কেনার নামে ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণের বিশাল অঙ্কের টাকা অর্থাৎ প্রায় ৯৪.১৩ শতাংশ (প্রায় ২৬২.৫০ কোটি টাকা) জালিয়াতির মাধ্যমে নদী ইনফ্রা, মুন্সি ম্যানুফ্যাকচারিং, নদী ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রো ইনফ্রাটেক এবং ইয়েস ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির মতো মাত্র পাঁচটি নির্দিষ্ট সংস্থায় ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
শুধু তাই নয়, এই বিপুল পরিমাণ অর্থের একটি বড় অংশ ঘুরে পরবর্তীতে আসবাবপত্র ব্যবসায়ী ‘আসবাবওয়ালা গ্রুপ’ বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ভুঁয়ো কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পৌঁছায়। উদাহরণস্বরূপ, নদী ইনফ্রা নামক সংস্থাটি ২০১০-১১ অর্থবছরে হুমা সিন্থেটিক্স প্রাইভেট লিমিটেডকে প্রায় ২১.৮৮ কোটি টাকার শর্ট-টার্ম লোন বা অ্যাডভান্স হিসেবে প্রদান করে, যা মূলত ইরফান আসবাবওয়ালা দ্বারা পরিচালিত একটি সংস্থা বলে জানা গেছে। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে কমন ডিরেক্টর, অভিন্ন ইমেল ডোমেন এবং একই ঠিকানা ব্যবহারের মতো বহু অসঙ্গতি ফরেনসিক অডিটে হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ব্যাঙ্কের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর গত বছরের শেষের দিকে এই অ্যাকাউন্টটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফ্রড’ বা জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ব্যাংক বা ঋণদাতা কনসোর্টিয়ামের মোট বকেয়া অঙ্ক ২৬২ কোটি থেকে শুরু করে পরবর্তীতে সুদে-আসলে বিশাল আকার ধারণ করে। এই ঘটনায় ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ১২০-বি এবং ৪২০ ধারা সহ দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। সিবিআইয়ের ইনস্পেক্টর ধর্মবীর রানার ওপর এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। ব্যাঙ্কের অভিযোগ, অভিযুক্তরা ঠান্ডা মাথায় অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করে ব্যাঙ্ককে অন্ধকারে রেখে আর্থিক তছরুপ চালিয়েছে। এই জালিয়াতি চক্রে অজ্ঞাতপরিচয় সরকারি আধিকারিক বা অন্য কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি।